বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৬:০০ অপরাহ্ন

খতিব-ইমাম-মুয়াজ্জিনদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও ভাতা দেবে বিএনপি

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৬২ বার

আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে ইমাম-খতিব-মুয়াজ্জিনদের সম্মানী দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে বলে জানিয়েছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, একই সঙ্গে ইমাম-মুয়াজ্জিনদের আর্থিকভাবে আরও স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে ইমাম-মুয়াজ্জিন কল্যাণ ট্রাস্টকে শক্তিশালী করে আরও বহুমুখী প্রকল্প গ্রহণ করার একটি চিন্তাভাবনা আমাদের রয়েছে। বিএনপি কখনো ইসলামের মূলনীতির সঙ্গে আপস করেনি, ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতেও করবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

গতকাল রোববার বিকেলে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (বিআইসিসি) সম্মিলিত ইমাম-খতিব পরিষদ আয়োজিত জাতীয় সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এমন অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তারেক রহমান। লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি তিনি সম্মেলনে অংশ নেন।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ইমাম, খতিব ও মুয়াজ্জিনদের আর্থিক সহায়তার কথা উল্লেখ করে বলেন, বিএনপি মনে করে সমাজ সংস্কারকের ভূমিকায় বা ভূমিকা পালনকারী ইমাম-খতিব-মুয়াজ্জিনরা যারা আর্থিকভাবে পিছিয়ে রয়েছেন, তাদের অবশ্যই প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা প্রদান রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এমন বাস্তবতায় ইমাম মুয়াজ্জিনদের মধ্যে যারা আর্থিক টানাপোড়েনে রয়েছেন, তাদের প্রতি মাসে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্মানী ভাতা দেওয়ার ব্যাপারে বিএনপির একটি পরিকল্পনা রয়েছে।

বিএনপি সবসময় ইসলামী সংস্কৃতির পক্ষে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, বিএনপি বরাবরই ইসলাম এবং মুসলমানদের স্বার্থবিরোধী যে কোনো অপতৎপরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার। পতিত পরাজিত পলাতক স্বৈরাচার ইসলাম, মুসলমান এবং ইসলামী সংস্কৃতিকে রাষ্ট্র এবং সমাজে নানাভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা করেছিল।

স্বাধীনতার পর ইচ্ছামতো সংবিধান রচনা করা হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, পতিত, পরাজিত, পলাতক স্বৈরাচারের দল যারা স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় বসে নিজেদের ইচ্ছামতো সংবিধান রচনা করেছিল, সেই সংবিধানে দেশের বেশিরভাগ জনগোষ্ঠীর আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন তখন ঘটেনি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। সংবিধানে সর্বশক্তিমান ‘আল্লাহর ওপর আস্থা এবং বিশ্বাস’ অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। বর্তমানে সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর আস্থা এবং বিশ্বাস কথাটি রাখা হয়নি। যে কোনো পেশা কিংবা চাকরির ক্ষেত্রে সার্টিফিকেটের গুরুত্ব বিবেচনা করে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ ডিগ্রি দাওরায়ে হাদিস অর্থাৎ তাকমিল সনদকে মাস্টার্স সমমানের স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ ২০০৬ সালে খালেদা জিয়ার সরকারের আমলেই নেওয়া হয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তারেক রহমান আরও বলেন, বিএনপি এমন একটি রাষ্ট্র, সমাজ ও সরকার ব্যবস্থার পক্ষে যেখানে সব ধরনের মানুষ যার যার নিজস্ব চিন্তা-চেতনা নিয়ে নিঃসঙ্কোচে কোরআন-সুন্নাহর আলোকে জীবন পরিচালনা করবেন। একই সঙ্গে অন্য ধর্মের যার যার সংস্কৃতি অনুযায়ী জীবন-যাপন করতে পারবেন। বিএনপি বিশ্বাস করে, ইমাম-খতিবরা প্রত্যেকেই একেকজন সমাজ সংস্কারক। নৈতিক সমাজ গঠনে তাদের অবদান প্রশংসনীয়।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, দেশে বর্তমানে কওমি ও আলিয়া, সরকারি-বেসরকারি, নিবন্ধিত বা অনিবন্ধিত সব মিলিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের ৫০ হাজারেরও বেশি মাদ্রাসা রয়েছে। এসব মাদ্রাসায় লাখ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। সরকারি কিংবা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় সারা দেশে সব মিলিয়ে মসজিদের সংখ্যা সাড়ে তিন লাখ বা তারও কিছু বেশি হতে পারে। এই মসজিদগুলোতে কমবেশি প্রায় ১৭ লাখ ইমাম, খতিব ও মুয়াজ্জিন ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করছেন। লাখ লাখ মসজিদ-মাদ্রাসা, ইমাম-মুয়াজ্জিন, মাদ্রাসা শিক্ষার্থীকে রাষ্ট্রীয় অগ্রগতিমূলক কার্যক্রমের বাইরে রেখে দেশে কখনো টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ বাস্তবতা থেকে বিএনপি আগামী দিনের কর্মসূচিতে এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

ইমাম-খতিবদের উত্থাপিত দাবিকে যৌক্তিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, আজকের এ সম্মেলনে আপনারা ইমাম খতিব ও মুয়াজ্জিনদের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি দাবি উপস্থাপন করেছেন। আপনাদের উপস্থাপিত দাবিগুলোর বেশ কয়েকটি দাবি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পূরণ করার সব ধরনের সুযোগ রয়েছে বলে আমি মনে করি। আপনারা ইমাম-খতিব-মুয়াজ্জিনদের জন্য সার্ভিস রুল প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন। আপনাদের এই দাবিটি অত্যন্ত যৌক্তিক।

তারেক রহমান বলেন, মসজিদ কমিটির ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপরে ইমাম মুয়াজ্জিনদের চাকরি নির্ভর করে। আমি মনে করি, এটি হওয়া উচিত নয়, এটি হতে পারে না। এটিকে আমি ইমাম-মুয়াজ্জিনদের বিরুদ্ধে অন্যায্য আচরণ বলে মনে করি। ইনশাআল্লাহ, আল্লাহর রহমতে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে সার্ভিস রুল প্রণয়নের ব্যাপারে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়নের উদ্যোগ বিএনপি সরকার গ্রহণ করবে। উপস্থাপিত অন্যান্য দাবি বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর উদ্যোগ বিএনপি সরকার ইনশাআল্লাহ গ্রহণ করবে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সবার কাছে দোয়া চেয়ে বলেন, পরিশেষে আমি আপনাদের কাছে দোয়া চাই। আমার মায়ের জন্য দোয়া চাই। আমার দলের নেতাকর্মী, সমর্থক এবং সর্বোপরি দেশবাসীর জন্য দোয়া চাই। দেশ এবং জনগণের কল্যাণে আল্লাহ যেন আমাকে এবং আমাদের দলকে প্রতিটি সৎকর্ম বাস্তবায়নের সুযোগ দেন। এজন্য আপনাদের দোয়া, সমর্থন এবং সহযোগিতা চাই।

সম্মেলন বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক মুফতি মুহিবুল্লাহিল বাকীর সভাপতিত্বে সম্মেলনে রাজনীতিকদের মধ্যে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, ন্যাশনালিস্ট ডেমোক্রেটিক মুভমেন্টের (এনডিএম) ববি হাজ্জাজ, আস সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের শায়খ আহমদুল্লাহ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমির হাবিবুল্লাহ মিয়াজী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী, ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব সাখাওয়াত হোসেন রাজি, হেফাজতে ইসলামের মাওলানা মহিউদ্দিন রাব্বানী, মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবসহ বিভিন্ন ইসলামী রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা এবং বিভিন্ন মসজিদের ইমামরা।

সম্মেলনে সাত দফা দাবি তুলে ধরেন মাওলানা আজহারুল ইসলাম। এগুলো হলো—সব ধর্মের প্রতি সহিষ্ণু হয়ে ইসলামী শরিয়াহকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে; রাষ্ট্রের জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে ইমাম-খতিবদের অংশগ্রহণের পাশাপাশি প্রতিটি জেলা, বিভাগীয় এবং থানা পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা কমিটিতে ইমাম-খতিবদের সম্পৃক্ত করতে হবে; মসজিদ, মাদ্রাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ ও পানির বিল মওকুফ করতে হবে; দেশের সব মসজিদের ইমামদের জন্য সার্ভিস রোল-নিয়োগবিধি প্রণয়ন করতে হবে এবং মসজিদ কমিটিতে সম্মানজনক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে; উপযুক্ত প্রমাণ ও তদন্ত ছাড়া কোনো ইমাম-খতিব ও আলেমকে গ্রেপ্তার বা হয়রানি করা যাবে না; সরকার স্বীকৃত দাওরায়ে হাদিসের সনদপ্রাপ্ত আলেমদের সরকারি মসজিদে ইমাম-খতিব নিয়োগ ও স্কুল-কলেজে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ এবং কাজি নিয়োগে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং ইমাম-খতিব কর্তৃক সমাজ সংস্কারমূলক কার্যক্রম, যেমন: মাদক ও যৌতুক নিরোধ, সুদ, ঘুষ ও অবৈধ সম্পদ অর্জনে নিরুৎসাহিত করা এবং পারিবারিক ঐতিহ্য ও সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষামূলক প্রভৃতি কার্যক্রমের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতে হবে এবং এ জন্য সম্মানজনক ভাতার ব্যবস্থা করতে হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com