

চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া ও পানগাঁ টার্মিনালের চুক্তি বাতিল এবং নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে অবরোধের ডাক দিয়েছে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)। আজকের (বুধবার) এই অবরোধ কর্মসূচিতে একাত্মতা প্রকাশ করেছে গণতান্ত্রিক বাম জোট ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনসহ ১৭টি শ্রমিক সংগঠন। এ ছাড়া স্কপ ও ১৩টিসহ মোট ৩০টি শ্রমিক সংগঠন এ আন্দোলনে শরিক হয়েছে।
এদিকে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব মোহাম্মদ শফিকুল আলম সম্প্রতি একটি টিভি টকশোতে অভিযোগ করেছেনÑ ‘বন্দরের চুক্তি নিয়ে যাঁরা বিরোধিতা করছেন, তাঁরা বন্দরের ‘তোলা’ খান অর্থাৎ চাঁদাবাজির ভাগ পান। এই চাঁদার ভাগ অনেক জায়গায় যায়, এ টাকায় অনেকেই ধনী হয়েছেন।’ প্রেস সচিবের এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনরত সংগঠনের নেতারা বলেছেন, আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতেই পরিকল্পিতভাবে একটি ট্যাগ লাগানোর অপচেষ্টা করা হচ্ছে। তাঁরা কেউ চাঁদাবাজিতে জড়িত নন; জড়িত থাকলে তার প্রমাণ দিতে বলেছেন। কারও ব্যক্তিগত স্বার্থ নয়, দেশ ও জনগণের স্বার্থে বন্দর রক্ষার আন্দোলন করছেন তাঁরা।
চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া চরে টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৩৩ বছরের চুক্তি করেছে সরকার। এই মেয়াদ আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ আছে চুক্তিতে। একই দিন কেরানীগঞ্জের পানগাঁ নৌ টার্মিনাল ২২ বছর মেয়াদে পরিচালনার জন্য সুইজারল্যান্ডের প্রতিষ্ঠান মেডলগ এসএর সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। গত ১৭ নভেম্বর ঢাকার একটি হোটেলে আয়োজিত পৃথক অনুষ্ঠানে চুক্তি দুটি স্বাক্ষর হয়েছে।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের লাভজনক নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার জন্য সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে; যদিও গত বৃহস্পতিবার উচ্চ আদালত সব প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। এ বিষয়ে আগামী ৪ ডিসেম্বর রায়ের দিন ধার্য করেছেন আদালত।
কঠোর আন্দোলনে শ্রমিক সংগঠনগুলো: বন্দর ইজারার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে গত কয়েক মাস ধরে নানা কর্মসূচি
পালন করে আসছে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)। গত মাসে বন্দর অভিমুখে মিছিল নিয়ে যেতে চাইলে পুলিশ তাঁদের বাধা দেয়। পরে সড়কে বসে পড়ে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। গত সপ্তাহে মানববন্ধন কর্মসূচি দিয়ে এই আন্দোলনে যোগ দেয় জামায়াতপন্থি শ্রমিক সংগঠন শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন।
তাদের দাবি, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের পাশেই বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ঘাঁটি ও লালদিয়ার চরের পাশেই বিমানবাহিনীর ঘাঁটি অবস্থিত। যেগুলো দেশের নিরাপত্তার জন্য খুবই স্পর্শকাতর। টার্মিনাল দুটি বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দিলে দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা আছে। আবার বিদেশি কোম্পানি দায়িত্ব নিলে অনেক শ্রমিকের চাকরি হারানোর আশঙ্কাও রয়েছে।
স্কপের সমন্বয়ক ও চট্টগ্রাম বন্দর সিবিএর সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল্লাহ বাহার বলেন, দেশীয় অপারেটরে যদি সরকারের আপত্তি থাকে, ড্রাইডকের মাধ্যমে বন্দর পরিচালনা করতে পারে সরকার। তবে বিদেশি কোম্পানির হাতে বন্দর তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ভালো হবে না। আজ বুধবার হালিশহর টোল প্লাজার প্রবেশমুখ, বড়পোল ও মাইলের মাথাÑ এ তিনটি স্পটে সর্বাত্মক অবরোধ হবে বলেও জানান তিনি।
চাঁদাবাজির ভাগের বিষয়ে নুরুল্লাহ বাহার বলেন, চাঁদাবাজি হয় সেটা তারা প্রমাণ করুক। আমাদের কেউ কোনো ধরনের চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত নয়। আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নিয়ে যেতে এ ধরনের মিথ্যা অভিযোগ তোলা হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য : চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি আমীর হুমায়ুন বলেন, লালদিয়া ও পানগাঁ টার্মিনালের চুক্তি করেছে। এখন এনসিটি দেওয়ার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। ডিপি ওয়ার্ল্ডকে কীভাবে ইজারা দিচ্ছে, সেটি জানানো হচ্ছে না। চট্টগ্রাম বন্দর জনগণের সম্পদ; তাহলে জনগণকে সবকিছু জানাতে সমস্যা কোথায়? সরকারের উচিত বিষয়টি খোলাসা করা।
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট খায়রুল আলম সুজন বলেন, এনসিটি একটি পরিপূর্ণ টার্মিনাল। সাইফ পাওয়ারটেক থেকে নিয়ে ড্রাইডক লিমিটেড পরিচালনার পর সক্ষমতা আরও বেড়েছে। তাহলে সেটিকে কেন বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দিতে হবে?
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক, ইউনাইটেড বিজনেস ফোরামের নেতা আমিরুল হক বলেন, আমরা বিদেশি বিনিয়োগের বিরুদ্ধে নই। আমরাও চাই বন্দরের সক্ষমতা বাড়ুক। কিন্তু কোনো কিছু যাচাই-বাছাই না করে বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া ঠিক হবে না। ব্যবসায়ী ও বন্দর ব্যবহারকারীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা দরকার।
সরব রাজনৈতিক দলগুলো : চট্টগ্রাম জেলা ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের (টিইউসি) সভাপতি তপন দত্ত আমাদের সময়কে বলেন, বিদেশিদের বন্দর ইজারা দিলে ক্ষতি ছাড়া লাভ হবে না। ডিপি ওয়ার্ল্ডের পেছনে আমেরিকা রয়েছে। ডিপি ওয়াল্ডের রেকর্ডও ভালো না।
চট্টগ্রাম বন্দরে আগে ৩ থেকে ৪ হাজার এবং ডক শ্রমিক ১৪ হাজার ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে বন্দর ও ডকে ১০ থেকে ১২ হাজার শ্রমিক আছেন। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে বন্দর ইজারা দিলে বেকারত্ব আরও বাড়বে। এরই মধ্যে ৫ শতাংশ বেকারত্ব বেড়েছে।
বাম গণতান্ত্রিক জোট চট্টগ্রাম জেলার সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শফিউদ্দিন কবির আমাদের সময়কে বলেন, বন্দরে দুর্নীতি হয়ে থাকলে কারা করে তার প্রমাণ সরকারের কাছে নিশ্চয় আছে; সেটা শ্বেতপত্রে প্রকাশ করুক।
সিপিবি চট্টগ্রাম জেলার সহকারী সাধারণ সম্পাদক নুরুচ্ছফা ভূঁইয়া আমাদের সময়কে বলেন, লালদিয়া এবং পানগাঁ টার্মিনালের চুক্তি বাতিল করতে হবে।
চট্টগ্রাম নগর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আমলে নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। লালদিয়ার চর যে প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে, সেটার সঙ্গে কনটেইনার ব্যবসায় জড়িত শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ এক আত্মীয়। পানগাঁ টার্মিনালের দায়িত্ব যে সুইস কোম্পানিকে দেওয়া হয়েছে, তার স্থানীয় এজেন্ট আওয়ামী নেতা সাবের হোসেন চৌধুরী। এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব পাচ্ছে ডিপি ওয়ার্ল্ড, যার স্থানীয় অংশীদারও সাবের হোসেন চৌধুরী। এভাবে স্বৈরাচারের দোসরদের হাতে বন্দরের মালিকানা তুলে দিতে চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-শ্রমিক-জনতা জীবন দেয়নি।
চুক্তি বাতিলের আহ্বান : বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি রাজনৈতিক বিবেচনায় করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি আয়োজিত মতবিনিময় সভায় তাঁরা এ মন্তব্য করেন।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, স্বচ্ছতা উপেক্ষা করে বিদেশি কোম্পানির হাতে টার্মিনাল তুলে দেওয়া দেশপ্রেমিক সরকারের কাজ হতে পারে না। সরকারের তাড়াহুড়া ও তথ্য গোপন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বলেন, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই এমন গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি করায় সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, এ সরকার জনগণের নয়। তারা অন্যের স্বার্থে তড়িঘড়ি করে এই চুক্তি করেছে। যুক্তিগুলো উদ্ভট ও গ্রহণযোগ্য নয়। এলডিপির সভাপতি শাহাদাৎ হোসেন সেলিম বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ ছাড়াই দেশীয় উদ্যোক্তারা টার্মিনাল নির্মাণে সক্ষম।
সভায় আরও বক্তব্য দেন ন্যাশনাল পিপলস পার্টির সভাপতি ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, গণসংহতি আন্দোলনের নির্বাহী সমন্বয়ক আবুল হাসান রুবেল, ভাসানী জনশক্তি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ড. আবু ইউসুফ সেলিম, গণঅধিকার পরিষদের মুখপাত্র ফারুক হাসান, নাগরিক ঐক্যের সাংগঠনিক সম্পাদক কবির হাসান এবং বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির আহ্বায়ক আর ইউ হাবিব।