বৃহস্পতিবার, ০৮ জানুয়ারী ২০২৬, ০৫:৩৫ অপরাহ্ন

ভোটের আগে জোটের খেলা, চলছে নানামুখী সমীকরণ

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৭২ বার

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে বিভিন্ন দলের মধ্যে জোট গঠন নিয়ে নানামুখী সমীকরণ; সমমনা দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার পরিবর্তে ক্ষেত্রবিশেষে বাড়ছে দূরত্ব। বিএনপি ইতোমধ্যে ২৭২ আসনে তাদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এ নিয়ে বিএনপির সমমনা দলগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে অসন্তোষ। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ৮টি ইসলামী দলের মধ্যে জোট হলেও আসন বণ্টনের বিষয়ে কোনো ঐকমত্য এখন পর্যন্ত হয়নি। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জোট গঠনের কথা বেশ কিছুদিন ধরেই চলছে। কিন্তু এ পর্যন্ত তা হয়নি। বাম দলগুলোরও মধ্যে একটি পৃথক জোট গঠনের প্রচেষ্টা জোরদার হচ্ছে শোনা গেলেও কোনো ঘোষণা এখনও আসেনি। এদিকে জাতীয় পার্টির নির্বাচনী জোট গঠন নিয়েও চলছে নানামুখী গুঞ্জন। সব মিলিয়ে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার আগে দেশের রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনা।

আগামী ১১ ডিসেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)Ñ এমন ইঙ্গিতের পর থেকেই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জোট সমীকরণ ও আসন বণ্টন নিয়ে ব্যাপক তৎপরতা দৃশ্যমান। ক্রমেই তীব্র হচ্ছে দলগুলোর হিসাব-নিকাশ, দাবি-দাওয়া ও অসন্তোষের প্রকাশ। এটি রাজনৈতিক অঙ্গনের সামগ্রিক স্থিতি ও ভবিষ্যৎ কৌশলকেও অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বর্তমানে রাজনীতির মাঠে বৃহত্তর শক্তি হিসেবে বিবেচিত বিএনপি দুই দফায় ২৭২টি আসনে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছে। বহুদিনের যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর জন্য ২৮টি আসন ফাঁকা রাখলেও ঘোষিত আসনগুলোতে তিন জোট-নেতার নিজ নিজ আসনে বিএনপি দলীয় প্রার্থী দেওয়ায় অসন্তোষ চরমে পৌঁছেছে। সমমনা দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ ও আলোচনার ভিত্তিতে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছেÑ বিএনপির এমন দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে দলগুলো। অভিযোগ উঠেছে, প্রথম দফায় ২৩৬ আসনে বিএনপি তাদের দলীয় প্রার্থী ঘোষণার আগে শরিকদের কাছ থেকে প্রার্থী তালিকা নিলেও পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের সম্পৃক্ত করা হয়নি। এ নিয়ে সমমনা দলগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। এসব দলের নেতাদের অনেকেই প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সূত্র জানায়, ঢাকার কয়েকটি আসন এনসিপি এবং অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টার জন্য সমঝোতা সাপেক্ষে ফাঁকা রেখেছিল বিএনপি। কিন্তু দ্বিতীয় ধাপে ঢাকার ৪টি আসনেও প্রার্থী ঘোষণার পর এ সম্ভাবনার ইতি ঘটে। শরিকদের জন্য খোলা রাখা আসনগুলো সম্পর্কেও বিএনপির নীতি এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। দলের একাধিক দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় অল্প কিছু আসনে সমঝোতা সম্ভব হলেও তালিকার বড় অংশ আর পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। এ কারণে যুগপৎ আন্দোলনে বিএনপির শরিকদের একটি বড় অংশ হতাশ।

দীর্ঘদিন বিএনপির সঙ্গে আন্দোলনে থাকা লেবার পার্টি ইতোমধ্যে সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা দিয়েছে। দলটির অভিযোগ, জোটসঙ্গীদের গুরুত্ব না দিয়েই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বিএনপি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ বিচ্ছেদ জোট রাজনীতির ভঙ্গুর চিত্র আরও প্রকট করে তুলেছে।

গণতন্ত্র মঞ্চের সমন্বয়ক ও বিপ্লবী ওয়াকার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক আমাদের সময়কে বলেন, বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান ও সাম্প্রতিক আচরণ শরিক দলগুলোর মধ্যে নতুন করে সন্দেহ অবিশ্বাস তৈরি করছে। তিনি বলেন, বিএনপি তার পুরনো কমিটমেন্ট থেকে সরে আসছে কিনা এটি এখন আমাদের দেখার বিষয়। এ দূরত্ব বাড়তে দিলে রাজনৈতিকভাবে আরও বড় দূরত্ব তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা শুভ হবে না। তিনি জানান, তফসিল ঘোষণা পর্যন্ত গণতন্ত্র মঞ্চের পক্ষ থেকে বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ ও আলাপ-আলোচনার চেষ্টা চলবে। পরবর্তী সমঝোতা পুরোপুরি নির্ভর করবে বিএনপির আচরণের ওপর। তারা কীভাবে সহযোগিতা করে, কীভাবে এগিয়ে আসে, সেটাই দেখার বিষয়।

ন্যাশনাল পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ আমাদের সময়কে বলেন, আমি অত্যন্ত মর্মাহত। কাল (আজ) আমাদের ১২ দলীয় জোটের বৈঠক আছে। সেখানেই আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সব মিলিয়ে, বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর মধ্যে জোটবদ্ধতার পরিবর্তে বিভাজন ও অসঙ্গতিই বেশি দৃশ্যমান।

ইসলামী দলগুলোর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ৮টি দলের জোট হলেও তারা এখনও আসন বণ্টনের বিষয়ে কোনো ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেনি। অন্যদিকে জামায়াত দলীয়ভাবে ৩০০ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে নির্বাচনী প্রচার শুরু করায় জোটসঙ্গীদের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতার পথ আরও সংকীর্ণ হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। জামায়াতের নেতৃত্বে গঠিত ইসলামী ৮টি দলের জোটের কাঠামো প্রাথমিকভাবে স্থাপিত হলেও আসন বণ্টন নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। অন্তর্ভুক্ত দলগুলোর মধ্যে আসন ভাগাভাগি নিয়ে মতপার্থক্য প্রকট। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী জোটের ভেতরে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান প্রকট হওয়ায় নির্বাচনী কৌশল অকার্যকর হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

অবশ্য এ বিষয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম বলেন, জামায়াতসহ একাধিক ইসলামী দলের সঙ্গে চলমান নির্বাচনী সমঝোতা খুবই ভালো অবস্থায় রয়েছে। আগের তুলনায় এখন অগ্রগতি আরও সুসংহত এবং পরিবেশও অনুকূল। গতকাল এক আলাপচারিতায় তিনি দাবি করেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে তাদের বিভাগীয় সমাবেশে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া পাওয়ায় দলের মনোবল আরও বেড়েছে। তিনি বলেন, মানুষ পরিবর্তন চায়। বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টির ৫৩ বছরের শাসন মানুষ দেখেছে। এখন তারা ইসলামের পক্ষে এবং দেশপ্রেমিকদের নেতৃত্বে একটি সরকার দেখতে চায়। সমঝোতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা আত্মপ্রকাশ কবে হবে, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সমঝোতা চূড়ান্ত হওয়ার পর নির্বাচনী আসন নিয়ে সিদ্ধান্ত হলে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে। আসন নিয়ে সমঝোতা শেষ হলে ইনশাআল্লাহ নির্ধারিত সময়ে আমরা তা ঘোষণা করব।

এদিকে এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি এবং আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দল পৃথক জোট গঠনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। তবে জোট ঘোষণার তারিখ বারবার পিছিয়ে যাওয়া এবং অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন অসঙ্গতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এসব দলও এখন পর্যন্ত দৃঢ় সমন্বয় গড়ে তুলতে সক্ষম হয়নি। আলোচনায় থাকা দলগুলোর মধ্যে নেতৃত্ব, আসন ভাগাভাগি ও সাংগঠনিক বিতর্কই বিলম্বের প্রধান কারণ বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক লিয়াজোঁ কমিটির প্রধান আরিফুল ইসলাম আদীব আমাদের সময়কে বলেন, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্রের শাসনতন্ত্রে মৌলিক পরিবর্তন প্রশ্নে জুলাই সনদ ইস্যুতে আমাদের ও বেশকিছু রাজনৈতিক দলের একই মনোভাব আছে। যেমন এবি পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ। জোটের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছেÑ সংস্কার প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন করা। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে জোট চূড়ান্ত হলে কৌশলগত নির্বাচনী জোটও হবে।

অন্যদিকে বামপন্থি কয়েকটি দলও নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে পৃথক জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। বাম গণতান্ত্রিক জোট তাদের বলয় বাড়াচ্ছে। আরও কয়েকটি বাম ঘরানার দলকে এতে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। যদিও ঐতিহাসিকভাবে বাম দলগুলোর নির্বাচনী প্রভাব সীমিত। এর পরও তাদের লক্ষ্যÑ রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখা ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সংগঠনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা। ফলে বাম জোটের রাজনৈতিক ও নির্বাচনী প্রভাব স্বল্প হলেও তাদের অভ্যন্তরীণ কৌশলগত আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

এ ছাড়া আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিক জাতীয় পার্টি-জেপি এবং জাতীয় পার্টি-জাপার একটি অংশ মিলে আগামীকাল (৮ ডিসেম্বর) নতুন জোটের আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে। গতকাল নতুন জোটের রূপরেখা নিয়ে দীর্ঘ বৈঠক করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ১৪ দলের অন্যান্য শরিকও বিশেষ করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ (ইনু), বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা, সেটি জানা যায়নি। ৫ আগস্ট পরবর্তী তাদের কার্যক্রমও চোখে পড়ছে না। জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি (জাপা) ভেতরে ভেতরে নির্বাচনী প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী কোনো জোটের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে দলটি।

এ বিষয়ে জাপা মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী আমাদের সময়কে বলেন, মাঠের পরিস্থিতি জরিপ করে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পারফরম্যান্স দেখে; ভোটের নিরাপত্তা, প্রার্থীর নিরাপত্তা, ভোটারের নিরাপত্তা, পোলিং এজেন্টদের নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয় দেখে আমরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব।

আগামী ১১ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণার সম্ভাবনাকে সামনে রেখে দেশের জোট-রাজনীতি এক জটিল ও অস্পষ্ট পর্যায়ের দিকে এগোচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনীতি-সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এখন পর্যন্ত দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা নয় বরং মতানৈক্যের বিস্তারই বেশি দৃশ্যমান। তফসিল ঘোষণার আগে চূড়ান্ত সমন্বয় কতটা সম্ভব হবে, তা এখনও অনিশ্চিত। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রারম্ভেই এমন টানাপড়েন রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নানা প্রশ্ন উত্থাপন করছে যা আগামী কয়েকদিনে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠতে পারে, বলছেন তারা।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com