

‘এলাম, দেখলাম, জয় করলাম’—এ সহজ সূত্রে রাজনীতিতে আসেননি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি এসেছেন ধীরে। নীরবে। দলের একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে। ক্ষমতার সিঁড়ি ডিঙিয়ে নয়; মাঠের রাজনীতি, মানুষের জীবন এবং দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়েই তার রাজনৈতিক ভিত্তির নির্মাণ।
বহু জুলুম, নির্যাতন, কারাবাস ও নির্বাসনের যন্ত্রণার পরও তারেক রহমান ফিরে এসেছেন—যেন পুড়ে ভস্ম হওয়ার পর বারবার উড়ে আসা পৌরাণিক ফিনিক্স পাখি। এই অনন্য পুনরুত্থানই তাকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে অন্য নেতাদের তুলনায় অনন্য অবস্থানে রাখে।
ইতিহাসে যেমন শেখ মুজিব, তাজউদ্দীন আহমদ, জিয়াউর রহমান ও ভাসানীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা জনগণের মনে জায়গা করে নিয়েছেন, তেমনি তারেক রহমানকে ধৈর্য, দূরদর্শিতা ও সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষমতা তাকে সময়ের আবর্তে অনন্য করে তুলেছে।
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮৩ সালে ক্ষমতা দখল করলে দেশে সামরিক শাসন চলে আসে। শেখ হাসিনা ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে যোগ দিলেও খালেদা জিয়া ভোট বর্জন করে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে মর্যাদা অর্জন করেন। এরপর ১৯৮৭-৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং এরশাদের পতন—সবার মধ্যে খালেদা জিয়ার আপসহীন অবস্থান তাকে গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
বিএনপি ক্ষমতায় আসে ১৯৯১ সালে। খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন আর সে সময়ই রাজনীতিতে প্রবেশ করেন তারেক রহমান। তিনি সরল সূত্রে নয়; বরং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরে মানুষ, ভাষা এবং বাস্তবতা বোঝেন।
তারেক রহমান ২০০২ সালে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হন। যুবসমাজকে রাজনীতিতে যুক্ত করা, তৃণমূল শক্তি তৈরি করা এবং সংগঠন গড়ে তোলা—এসব ক্ষেত্রেই তিনি বিশেষ কৃতিত্ব দেখান। তার ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা বিরোধীদের আতঙ্কিত করে। তার বিরুদ্ধে শুরু হয় পরিকল্পিত অপপ্রচার।
তারেক রহমানের পাল্টা শক্তি হিসেবে আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে সামনে আনার চেষ্টা করে। ২০০৩ সালে জয়ের আগমন রাজনৈতিক প্রদর্শনীতে রূপ নেয়। তবে তুলনার রাজনীতি দ্রুতই ব্যর্থ হয়। জয় শিগগিরই ব্যর্থ প্রমাণিত হন। তবু আওয়ামী লীগের দিক থেকে তারেক রহমানের বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে তোলার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে।
২০০৭ সাল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের আরেক কলঙ্কিত অধ্যায়। ওই বছর সেনাসমর্থিত একটি ভুঁইফোঁড় সরকার ক্ষমতা দখল করে। গ্রেপ্তার হন শেখ হাসিনা, বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমানসহ আরও অনেকে। শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে আপস করে বিদেশে চলে গেলেও খালেদা জিয়া প্রমাণ করেন—দেশ, জনগণ ও গণতন্ত্রের জন্য তিনি আপসহীন। তিনি দেশে থেকে যান। ‘আপসহীন নেত্রী’ থেকে তিনি মানুষের চোখে গণতন্ত্রের প্রতীক, গণতন্ত্রের মা হয়ে ওঠেন।
অন্যদিকে দীর্ঘ কারাবাস ও সামরিক অত্যাচারে তারেক রহমান গুরুতর অসুস্থ হন। দেশের চিকিৎসক যখন তার চিকিৎসা চালানোয় অক্ষমতা প্রকাশ করেন, তখন সরকার বাধ্য হয়ে তাকে ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্যে চিকিৎসার জন্য পাঠায়।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে সংসদে যোগ দেন খালেদা জিয়া। তিনি ১/১১-এর সরকারের সব কুশীলবের বিচারের দাবি জানান। অন্যদিকে শেখ হাসিনা মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীন সরকারের সংশ্লিষ্ট সবাইকে দেশ ছাড়ার সুযোগ দিয়ে ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের ষড়যন্ত্রমূলক চরিত্র প্রমাণ করেন। ২০০৯ সাল থেকে শেখ হাসিনা প্রথমে জিয়া পরিবার, এরপর বিএনপি এবং বিরোধী মত দমনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। এ পরিস্থিতিতে ২০০৯ সালের বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তারেক রহমান জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব থেকে জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এর মাধ্যমে তিনি দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী মহলে প্রবেশ করেন।
আওয়ামী লীগ ২০০৯ থেকে বিএনপিকে নেতৃত্বশূন্য করার জন্য তারেক রহমানের বিরুদ্ধে নতুন ষড়যন্ত্র শুরু করে। একের পর এক মামলা দিয়ে তাকে ঘিরে ফেলা হয় যেন তিনি লন্ডন থেকে দেশে ফিরতে না পারেন।
আদালতের একটি রায়ের ভিত্তিতে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী আনা হয় ২০১১ সালে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। বিএনপি এটিকে ‘গণতন্ত্রবিরোধী’ ঘোষণা করে এবং নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবি তোলে। সে সময় থেকে শুরু হয় গুম, খুন, অপহরণ ও নির্যাতনের রাজনীতি।
শেখ হাসিনার দুরভিসন্ধি বুঝতে পেরে সংসদ ও সংসদের বাইরে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আন্দোলন জোরদার হয়। ২০১১ সালের পর শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে তারেক রহমান লন্ডন থেকে রাজনৈতিকভাবে মায়ের পাশে দাঁড়ান। ইন্টারনেটের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের দিকনির্দেশনা দেন, রাতভর যোগাযোগ রাখেন এবং দলের সংগঠনকে নতুন শক্তি দেন। তার এক ফোনকল যেন ক্ষেপণাস্ত্র হয়ে আছড়ে পড়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতির মাঠে।
শেখ হাসিনা সরকার ২০১৩ সালে নির্মমভাবে দমন করে হেফাজতের ‘ঢাকা অবরোধ’। অনেকেই এ দমনকে সফল রাজনীতি বলে মনে করতে থাকেন। ২০১৪ সালে প্রবল প্রতিরোধের মধ্যেও একতরফাভাবে নির্বাচন করে আবারও ক্ষমতায় বসেন তিনি। কিন্তু খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নির্দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলন। দিশেহারা সরকার খালেদা জিয়াকে গৃহবন্দি রাখে এবং তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তখন দেশের মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—রাজনৈতিকভাবে শেখ হাসিনা তারেক রহমানের কাছে পরাজিত।
লন্ডন থেকে তারেক রহমান শুধু রাজনৈতিক বার্তা দেননি; দলকে সুসংগঠিত করতেও নেতৃত্ব দিয়েছেন। একই সময়ে আওয়ামী লীগ সজীব ওয়াজেদ জয়কে রাজনৈতিক পরিসরে জোরপূর্বক প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। ২০১৪ সালে জয়ের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন ঢাকার রাজনীতিতে হৈচৈ সৃষ্টি করে। তবে অচিরেই স্পষ্ট হয়, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও ভাবমূর্তির দিক থেকে জয় তারেক রহমানের ধারেকাছেরও কেউ নন। তারেক রহমানের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, উদার গণতন্ত্রের মানসিকতা ও নেতৃত্বের কারণে সাধারণ মানুষ তাকে তুলনা করতে শুরু করেন ৪০ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শেখ হাসিনার সঙ্গে।
২০১৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে জয়কে নেতৃত্বে আনার চেষ্টা ব্যর্থ হয়; জয় নিজেও রাজনীতির চেয়ে অর্থনৈতিক স্বার্থ হাতানোর পথ বেছে নেন। রাজনীতিতে ছেলের ব্যর্থতায় শেখ হাসিনা শেষ সম্বল হিসেবে মেয়ে পুতুলকে সামনে আনার চেষ্টা করেন। ধীরে ধীরে শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী চরিত্র ফ্যাসিস্ট রূপ ধারণ করে।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা ও প্রজ্ঞার কারণে ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে তাকে জেলবন্দি করা হয়। ফলে দলের নেতৃত্বের ভার গ্রহণ করতে বাধ্য হন তারেক রহমান। তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তার কাঁধে আসে গণতন্ত্র রক্ষা ও ভোটের অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব।
২০১৮ সালের প্রহসন নির্বাচনের পর শেখ হাসিনা এক ভয়ংকর রাজনীতিবিদে পরিণত হন, যা দেশের সব ক্ষেত্রে অকার্যকর ও তাঁবেদার রাষ্ট্র তৈরি করার প্রচেষ্টা চালায়। কিন্তু তারেক রহমান বিচক্ষণভাবে গণতান্ত্রিক পন্থায় এ ফ্রাংকেনস্টাইন মোকাবিলা করেন এবং সাধারণ মানুষের কাছে একমাত্র ভরসার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন।
২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত হাজার মাইল দূরে থেকেও তিনি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। তৃণমূল থেকে উঠে আসা একজন নেতা হিসেবে সবসময় সাধারণ মানুষের পাশে থেকেছেন। ফলস্বরূপ, তিনি আজ দেশের রাজনীতিতে এক অবিসংবাদিত নেতা এবং সময়ের আবর্তে অতুলনীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
১৫ বছরের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রবাহ তখনই চূড়ান্ত তুঙ্গে পৌঁছায়, যখন একটি কোটাবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্রোত মিশে যায় জনগণের দীর্ঘ আন্দোলনের যৌক্তিকতার সঙ্গে। সারা বাংলাদেশ তখন একহাতে শপথ নেয়। ছাত্র-জনতার আকাঙ্ক্ষা এক দফায় মিলিত হয়। হাজার প্রাণের বিনিময়ে ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে ফ্যাসিস্ট হাসিনার পলায়নের মাধ্যমে শেষ হয় দেশের ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়।
রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এবং ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ছাত্রদের অংশগ্রহণে শপথ নেয় একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। দায়িত্ব গ্রহণ করেন বাংলাদেশের একমাত্র নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
দূরদর্শী রাজনীতিবিদ তারেক রহমান ২০২৪ সালের আগস্টে বারবার সতর্ক করেন, ‘যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি, সামনে আরও কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।’ তিনি জানতেন, পরাজিত ফ্যাসিস্টরা বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার ষড়যন্ত্র চালাবেই। তাই দ্রুত জাতীয় নির্বাচনই সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর সমাধান। কিন্তু কিছু মানুষ ড. ইউনূসকে সামনে রেখে রাজনীতির পানি ঘোলা করে অর্থ শিকারে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তারা অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা দীর্ঘ করার পরিকল্পনায় লিপ্ত হন। তবে সেই পরিকল্পনা নস্যাৎ হয়। গত ১৩ জুন লন্ডনের দ্য ডরচেস্টার হোটেলে এক ঐতিহাসিক সভায় মিলিত হন তারেক রহমান ও ড. ইউনূস। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে সেখানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত হয় আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সভা শেষে তারেক রহমানের হাসিমুখেই লেখা হয় আরেকটি ইতিহাস। বাংলাদেশের নেতৃত্বে ‘সব ধাপ পেরিয়ে, উঁচু করে আকাশে’ তিনিই একজন এবং অদ্বিতীয়। রবীন্দ্রনাথের সেই ‘তালগাছ’ কবিতার তালগাছ যেমন ‘এক পায়ে দাঁড়িয়ে/ সব গাছ ছাড়িয়ে/ উঁকি মারে আকাশে’, তেমনি তিনিও যেন সব বাধা ডিঙিয়ে, সবাইকে ছাড়িয়ে, সব ধাপ পেরিয়ে আজ মহীরূহের মতো নিজের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছেন।
লেখক: নির্মাতা, সাংবাদিক ও সম্প্রচারক