শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০১:১৫ অপরাহ্ন

এনসিপির দুই নেত্রীর পদত্যাগ, দুজনের নিষ্ক্রিয় থাকার ঘোষণা

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৫৮ বার

নানান আলোচনা-সমালোচনা, অভ্যন্তরীণ গোলযোগ ও নাটকীয়তার পর আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে ইসলামীসহ সমমনা আটটি দলের নির্বাচনী জোট ও সমঝোতার অংশ হয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এই জোটে দলটি ৩০ থেকে ৩৫টি আসন পাচ্ছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় রয়েছে অন্তত পাঁচটি আসন। চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা আজ সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে বলে এনসিপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। দলের প্রার্থীরা নিজেদের দলীয় শাপলা কলি প্রতীকেই নির্বাচনে অংশ নেবেন। আর যেসব আসনে প্রার্থী থাকবে না, ওইসব আসনে জোটের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবেন এনসিপির নেতাকর্মীরা। নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন আট দলীয় জোটে যোগ দিয়েছে এনসিপি ও এলডিপি। এর ফলে এই জোটে মোট দলের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০টিতে। গতকাল রোববার আট দলের পক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে এ তথ্য জানান জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। পরে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে এনসিপির পক্ষ থেকে জামায়াতের জোটে যাওয়ার তথ্য জানান দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।

এনসিপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা জানিয়েছেন, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে ৩০ থেকে ৩৫টি আসনের নিশ্চয়তা আছে। এর মধ্যেই দরকষাকষি চলছে। আজ সমঝোতা চূড়ান্ত হয়ে যাবে এবং সংশ্লিষ্টগুলো আসনগুলোর নাম ঘোষণা করা হবে। ঢাকায় এনসিপির জন্য অন্তত পাঁচটি আসন থাকছে। এর মধ্যে শীর্ষস্থানীয় দুই নেতার আসনও পরিবর্তন হচ্ছে। তাদের মধ্যে, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ঢাকা-৮ থেকে নির্বাচন করতে পারেন। তিনি এর আগে ঢাকা-১৮ থেকে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। অন্যজন সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব, তিনি ঢাকা-১৮ আসন থেকে নির্বাচন করবেন। এনসিপির পক্ষ থেকে ঢাকা-১৬-এ মনোনয়ন পেয়েছিলেন তিনি। এ ছাড়া ঢাকা-১১ আসনে আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, ঢাকা-৭ আসনে তারেক এ আদেল, ঢাকা-৯ আসনে জাবেদ রাসিন ও ঢাকা-১৯ আসনে দিলশানা পারুলের নির্বাচন করার কথা শোনা যাচ্ছে।

এ ছাড়া ঢাকার বাইরের আসনগুলোর মধ্যে চূড়ান্ত মনোনয়নের অপেক্ষায় আছেন এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন রংপুর-৪, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ কুমিল্লা-৪, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম পঞ্চগড়-১, আব্দুল হান্নান মাসউদ নোয়াখালী-৬, সারোয়ার তুষার নরসিংদী-২, আতিক মুজাহিদ কুড়িগ্রাম-২, আব্দুল্লাহ আল আমিন নারায়ণগঞ্জ-৪, সাইফ মোস্তাফিজ সিরাজগঞ্জ-৬, ডা. মাহমুদা মিতু ঝালকাঠি-১ ও প্রীতম দাস মৌলভীবাজার-৪ আসনে। বাকি আসনগুলো নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে।

এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক দুই ‘ছাত্র উপদেষ্টা’র মধ্যে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে। তিনি এনসিপির পক্ষ থেকে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত এখনো নেননি। এনসিপি থেকে না করলে বিএনপি থেকে কিংবা স্বতন্ত্র নির্বাচন করবেন বলে জানা গেছে। এনসিপির নেতাদের প্রত্যাশা, আসিফ মাহমুদ শেষ পর্যন্ত তাদের দল থেকেই নির্বাচনে অংশ নেবেন। আসিফ ঢাকা-১০ এবং কুমিল্লা-৩ থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। সমীকরণ যেদিকে মিলবে, সেখানেই তিনি নির্বাচন করবেন। অন্যদিকে, অপর সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম এনসিপির অংশ হচ্ছেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। জামায়াত ও এনসিপির নির্বাচনী সমঝোতার ঘোষণা দেওয়ার পর গতকাল রাতে এক ফেসবুক পোস্টে এ কথা জানান মাহফুজ নিজেই। জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির নির্বাচনী সমঝোতার আওতায় প্রার্থী হতে তাকেও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল জানিয়ে মাহফুজ আলম বলেছেন, ‘আমার জুলাই সহযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান, স্নেহ ও বন্ধুত্ব মুছে যাবে না। কিন্তু আমি এ এনসিপির অংশ হচ্ছি না। আমাকে জামায়াত-এনসিপি জোট থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়নি, এটা সত্য নয়। কিন্তু ঢাকার কোনো একটা আসনে জামায়াত-এনসিপি জোটের প্রার্থী হওয়ার চেয়ে আমার লং স্ট্যান্ডিং পজিশন (দীর্ঘদিনের অবস্থান) ধরে রাখা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।’

এদিকে জামায়াতের সঙ্গে জোটে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগে ও পরে এনসিপির দুই নেত্রী পদত্যাগ করেছেন। দলের প্রতি ‘অবিশ্বাস ও অনাস্থা’ জানিয়ে পদত্যাগ করেছেন যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীন। গতকাল ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে তিনি পদত্যাগের কারণ জানান এবং জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি তোলেন। এর একদিন আগে শনিবার দল থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন দলের সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবেন বলে জানিয়েছেন।

এ ছাড়া জামায়াতের সঙ্গে জোট নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে এনসিপির হয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন নওগাঁ-৫ আসনে সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ও দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন। আর নির্বাচনকালে দলের সব কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় থাকবেন জানিয়ে ঘোষণা দিয়েছেন দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম। তিনিও ফেসবুকে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান।

জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা নিয়ে দুই নারীনেত্রীর পদত্যাগ ও বেশ কয়েকজন নেতার আপত্তি দলে ভাঙন আনছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, তারা তাদের দলের নির্বাহী ‘বডি’র (পরিষদ) সঙ্গে আলোচনা করে, সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে জোটের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যেকোনো মতামতের ক্ষেত্রে কারও ভেটো (আপত্তি) থাকতে পারে, মতামত থাকতে পারে। তবে তিনি মনে করেন, এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটি, সারা দেশের নেতাকর্মীরা এবং সহযোগী সংগঠনের নেতারা জোটের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে একমত। নাহিদ আরও বলেন, ‘যারা বিরোধিতা করছে, তাদের সঙ্গে আমরা কথা বলব। তাদের আরও বোঝানোর চেষ্টা করব। আশা করি, তারা এনসিপির এই সিদ্ধান্তের সঙ্গেই থাকবে।’

সংবাদ সম্মেলনে এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, ‘নির্বাচনের বিষয়ে আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি। এনসিপির পক্ষ থেকে আমরা প্রথম থেকে বলেছি নির্বাচনে আমরা এককভাবে অংশগ্রহণ করতে চাই। আমরা ৩০০ আসনে প্রার্থী দিতে চেয়েছিলাম। সে অনুযায়ী আমাদের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা চলছিল। আমরা সারা দেশ থেকে মনোনয়ন আহ্বান করেছি। পরে আরও দুটি দলের সঙ্গে আমাদের রাজনৈতিক সমঝোতা হয়েছিল সংস্কার প্রশ্নে; কিন্তু এরপর শরিফ ওসমান হাদিকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে আমরা বুঝতে পারছি যে, বাংলাদেশে আধিপত্যবাদী আগ্রাসন শক্তি এখনো কার্যকর। তারা এখনো চক্রান্ত করছে নির্বাচন বানচাল করতে।’

এমন পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে তাদের মনে হয়েছে এই মুহূর্তে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ করতে বৃহত্তর ঐক্য প্রয়োজন উল্লেখ করে নাহিদ বলেন, ‘সেই তাগিদ থেকে আমরা জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোটের আট দলের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের (জামায়াতসহ ৮ দল) নির্বাচনী সমঝোতায় এনসিপি সম্মত হয়েছে। আমরা জাতীয় নাগরিক পার্টি এবং এই আট দলের সঙ্গে আমরা একসঙ্গে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে এই নির্বাচনী সমঝোতা একদিকে যেমন নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য। অন্যদিকে সংস্কার, বিচার ও আধিপত্যবাদবিরোধী দুর্নীতিবিরোধী কর্মসূচিও থাকবে। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী যে আকাঙ্ক্ষা সেটা যেন কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, এজন্য আমরা একটা বৃহত্তর ঐক্যের জায়গায় পৌঁছেছি।’

সমঝোতা চূড়ান্ত করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা আগামীকাল আমাদের প্রার্থীর বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা দেবো। সমঝোতায় আমাদের প্রার্থীরা নমিনেশন ফর্ম জমা দেবেন। যেখানে আমাদের প্রার্থী থাকবে না, সেখানে জোটের অন্য দলের প্রার্থীর পক্ষে ক্যাম্পেইন করব।’

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com