

রাজধানীর সরকারি সাত কলেজকে নিয়ে প্রস্তাবিত ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রণীত অধ্যাদেশের চূড়ান্ত খসড়া গত রবিবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ প্রয়োজনীয় সব প্রশাসনিক ও নীতিগত কার্যক্রম সম্পন্ন করে অনুমোদনের জন্য এই খসড়া পাঠায়।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অধ্যাদেশ প্রণয়নের পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল সুপরিকল্পিত ও অংশগ্রহণমূলক। খসড়া চূড়ান্ত করার আগে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মতামত সংগ্রহ, ওয়েবসাইটে প্রকাশের মাধ্যমে জনমত গ্রহণ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সুশীল সমাজের সঙ্গে মতবিনিময় সভা আয়োজন এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ করা হয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, অধ্যাদেশ প্রণয়নের মূল লক্ষ্য ছিল স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য একটি কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলা। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের যৌক্তিক প্রত্যাশা ও উদ্বেগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। সবার ধৈর্যশীল সহযোগিতা ও গঠনমূলক ভূমিকার ফলেই এই জটিল প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, একটি টেকসই ও বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য মৌলিক নীতিগত সংস্কার ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতি ধাপে ধাপে সম্পন্ন করা জরুরি। যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি এই বৃহৎ উদ্যোগকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ কারণে অধ্যাদেশটি অনুমোদনের চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকায় জনদুর্ভোগ সৃষ্টি বা স্বাভাবিক জনজীবন ব্যাহত হয়Ñ এমন কর্মসূচি থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও অনিশ্চয়তা
অধ্যাদেশের গেজেট প্রকাশে বিলম্ব এবং কলেজগুলোর স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ন থাকবে কিনাÑ এই অনিশ্চয়তা থেকেই সম্প্রতি সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন। তাদের দাবি, কলেজগুলোর স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে দ্রুত অধ্যাদেশের গেজেট প্রকাশ করতে হবে।
এ বিষয়ে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির প্রশাসক ও ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক একেএম ইলিয়াস বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের দাবির আলোকে সাত কলেজের স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ন রেখেই অধ্যাদেশটি চূড়ান্ত করা হচ্ছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সবার স্বার্থ বিবেচনায় নিয়েই খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হলেও এতে শিক্ষার্থীদের স্বার্থ কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। একই সঙ্গে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করেÑ এমন কর্মসূচি এড়িয়ে ধৈর্যের সঙ্গে প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সংশোধিত খসড়ায় কী পরিবর্তন এসেছে
গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত প্রাথমিক খসড়া অধ্যাদেশে সাতটি কলেজকে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির পৃথক ক্যাম্পাস হিসেবে পরিচালনার প্রস্তাব ছিল। উদাহরণ হিসেবে তিতুমীর কলেজের নাম পরিবর্তন করে ‘সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি তিতুমীর কলেজ’ করার কথা বলা হয়েছিল।
তবে শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন পক্ষের আপত্তির পর সংশোধিত খসড়ায় এই কাঠামো পরিবর্তন করা হয়েছে। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, সাতটি কলেজ ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির সঙ্গে ‘সংযুক্ত কলেজ’ হিসেবে বিবেচিত হবে। কলেজগুলোর বর্তমান বৈশিষ্ট্য, অবকাঠামো, সম্পত্তি ও সুযোগ-সুবিধা অপরিবর্তিত থাকবে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ নামে একটি মূল বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামো গড়ে তোলা হবে। ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা মূল ক্যাম্পাস অথবা সংযুক্ত কলেজÑ যে কোনো একটিতে ভর্তি হতে পারবেন।
হাইব্রিড পদ্ধতি থেকে সরে আসা
প্রাথমিক খসড়ায় সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ ক্লাস ভার্চুয়াল মাধ্যমে নেওয়ার প্রস্তাব ছিল। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মহলের আপত্তির পর সংশোধিত খসড়ায় ভার্চুয়াল বা হাইব্রিড পদ্ধতির কোনো উল্লেখ রাখা হয়নি।
এ ছাড়া আগের খসড়ায় সাত কলেজকে চারটি ‘স্কুলে’ ভাগ করে পাঠদানের কথা বলা হলেও সংশোধিত খসড়ায় এই কাঠামো বাতিল করা হয়েছে। এর পরিবর্তে প্রচলিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো অনুষদভিত্তিক কাঠামো রাখা হয়েছেÑ যার মধ্যে কলা, বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা, আইন, চিকিৎসা, চারুকলাসহ অন্যান্য অনুষদ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, ইডেন মহিলা কলেজ ও বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজে শুধু নারী শিক্ষার্থীদের জন্যই পাঠদান কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এই দুই কলেজে পুরুষ শিক্ষার্থীদের ভর্তির সুযোগ রাখা হয়নি।
যে সাত কলেজ নিয়ে গঠিত হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি গঠিত হচ্ছে রাজধানীর সাতটি ঐতিহ্যবাহী সরকারি কলেজকে কেন্দ্র করে। এগুলো হলোÑ ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ ও তিতুমীর কলেজ।
চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষা
শিক্ষা মন্ত্রণালয় আশা প্রকাশ করেছে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অনুমোদন শেষে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই অধ্যাদেশের গেজেট প্রকাশ করা সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে শিগগিরই ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হবেÑ যা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।