শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১১:১৩ পূর্বাহ্ন

কূটনীতিকদের আগ্রহের কেন্দ্রে আসন্ন নির্বাচন

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ২৬ বার

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণের আর মাত্র ২০ দিন বাকি। আজ বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হচ্ছে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারাভিযান। এর প্রাক্কালে গত কয়েক দিন নির্বাচনকে ঘিরে বিদেশি কূটনীতিকদের লক্ষণীয় তৎপরতা দেখা গেছে। প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন ও বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে একের পর এক বৈঠক করে আসছেন বিদেশি রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশন এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা। তারা মূলত নির্বাচনের পরিবেশ, নিরাপত্তা, অংশগ্রহণ ও গ্রহণযোগ্যতাসহ সার্বিক পরিস্থিতি বোঝার পাশাপাশি নিজেদের অবস্থান ও প্রত্যাশা তুলে ধরছেন। প্রচার শুরুর প্রাক্কালে এই কূটনৈতিক তৎপরতা নির্বাচনের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরদারি ও আগ্রহকে নতুন করে স্পষ্ট করেছে।

গত ২৫ ডিসেম্বর বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে আসার পর তার সঙ্গে একাধিক দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারদের সাক্ষাৎ হয়েছে। এসব বৈঠকে নির্বাচনকালীন পরিবেশ, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, সহিংসতা এড়ানো, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নির্বাচনের পর বাংলাদেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সম্পর্কের ধারাবাহিকতা নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচনায় বিএনপির পক্ষ থেকে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয় এবং দলটির রাজনৈতিক অবস্থান ও প্রত্যাশা ব্যাখ্যা করা হয়। কূটনীতিকদের পক্ষ থেকে শান্তিপূর্ণ প্রচার, ভোটারদের নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আস্থার গুরুত্বের কথা বলা হয়। একাধিক বৈঠকে নির্বাচনপরবর্তী সময়ে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

গত ১০ জানুয়ারি ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা তারেক রহমানের সঙ্গে গুলশানে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কসহ সাধারণ পররাষ্ট্র বিষয় নিয়ে কথা বলেন। ১৭ জানুয়ারি বিকালে প্রথমে যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার সারাহ কুক, পরে ভুটানের রাষ্ট্রদূত দাসো কর্মা হামু দর্জি ও নেপালের রাষ্ট্রদূত ঘনশ্যাম ভান্ডারী তারেক রহমানের সঙ্গে তার রাজনৈতিক কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। তাদের আলোচনা ছিল পারস্পরিক সহযোগিতা, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, শুভেচ্ছা বিনিময় ও বাংলাদেশের নির্বাচনী পরিবেশসহ বিভিন্ন দিক নিয়ে। ১৮ জানুয়ারি সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত রেটো রেঙ্গলি এবং একই দিনে ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত পাওলো ফার্নান্দো উরধং তারেক রহমানের সঙ্গে পৃথক সৌজন্য সাক্ষাতে অংশ নেন। তাদের পৃথক আলোচনায় ছিল বাংলাদেশ-সুইজারল্যান্ড ও বাংলাদেশ-ব্রাজিলের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়ন, সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্র ও সাধারণ কুশল বিনিময়।

১৯ জানুয়ারি নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন তারেক রহমানের গুলশান কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন; আলোচনায় ছিল বাংলাদেশ-মার্কিন সম্পর্ক, আগামী নির্বাচন, শান্তি ও সমৃদ্ধি অর্জনে দুই পক্ষের সহযোগিতা বৃদ্ধির উপায়। একই দিন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদ্বয় এবং জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন, ইতালির প্রতিনিধিরা সম্মিলিতভাবে বিএনপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং বিবিধ ক্ষেত্রে সহযোগিতা ও সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ করেন।

পরের দিন গত মঙ্গলবার নরডিক অঞ্চলের সুইডেন, নরওয়ে ও ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূতদের পাশাপাশি রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার গ্রিগোরিয়েভিচ খোজিন তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য বৈঠকে অংশ নেন। তাদের পৃথক আলোচনায় ছিল বাংলাদেশ ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে শক্ত করার পন্থা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শক্তি, শিক্ষা ও অন্যান্য সহযোগিতামূলক ক্ষেত্র সম্প্রসারণ, নির্বাচন এবং জাতীয় স্বার্থের ব্যাপারে মতবিনিময়।

একই সময়ে নির্বাচন কমিশনেও কূটনৈতিক আনাগোনা বেড়েছে। চলতি মাসে ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনাররা প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য কমিশনারদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এসব বৈঠকে ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, পর্যবেক্ষকদের ভূমিকা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে কমিশনের প্রস্তুতি ও নিরপেক্ষ অবস্থানের কথা তুলে ধরা হয় এবং বিদেশি পর্যবেক্ষকদের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়। কূটনীতিকরা কমিশনের কাছে নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও ভোটের দিন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চান।

নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমিরের সঙ্গেও কয়েকজন বিদেশি কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিনিধির সাক্ষাৎ হয়েছে। এসব বৈঠকে নির্বাচনের রাজনৈতিক পরিবেশ, দলটির অবস্থান এবং অংশগ্রহণ সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয়। কূটনীতিকরা বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের মতামত শুনে সামগ্রিক পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছেন বলেও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যে দীর্ঘ মেয়াদে দেশজুড়ে নির্বাচনী পর্যবেক্ষক মোতায়েন করেছে। ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশনের সদস্যরা জেলা ও মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছেন। তারা ভোটার তালিকা, প্রচারণার পরিবেশ, প্রশাসনিক প্রস্তুতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নির্বাচনী বিধি মানা হচ্ছে কিনা, এসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করছেন। ভোটগ্রহণের দিন আরও স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষক যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ইইউ জানিয়েছে, তাদের পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়া ভোটের আগের সময় থেকে শুরু করে ভোটগ্রহণ ও পরবর্তী ধাপ পর্যন্ত বিস্তৃত থাকবে এবং সব পর্যবেক্ষণ পেশাদার ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হবে।

এর অংশ হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলের সঙ্গে পৃথকভাবে সাক্ষাৎ করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এবং চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের নেতারা। গত মঙ্গলবার রাতে নগরীর দুটি ভিন্ন স্থানে এসব বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষক মøাদেন কোবাসেভিচের নেতৃত্বে তিন সদস্যের প্রতিনিধি দলে ছিলেন দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষক সুজান জিন্ডেল ও পর্যবেক্ষক সহকারী মো. মাসুক হায়দার। নগরীর টাইগারপাসে চসিক কার্যালয়ে মেয়রের সঙ্গে বৈঠকে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে করণীয় বিষয়ে তার মতামত জানতে চান।

বৈঠকে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ২০০১ সালের পর দেশে কোনো নির্বাচনই পুরোপুরি অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি। এতে গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়েছে। গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হলে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর হতে হবে। এর আগে চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের কার্যালয়ে ইইউ পর্যবেক্ষক দলের সঙ্গে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় নগর জামায়াতের আমির নজরুল ইসলাম অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার এবং নির্বাচনের আগে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার দাবি জানান।

নির্বাচন কমিশন ও কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এবার বিশ্বের প্রায় ২৮টির মতো দেশ এবং একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা নির্বাচন পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশে আসতে পারে। এর মধ্যে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি দল রয়েছে। কেউ দ্বিপাক্ষিক পর্যবেক্ষক হিসেবে, কেউ আবার আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন। এই উপস্থিতি নির্বাচনের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এদিকে গতকাল বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন বলেছেন, তার দেশ নির্বাচনে কোনো পক্ষ নেবে না এবং ভোটাররা যাকে ভোট দিতে চায়, তা বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত গতকাল ঢাকার ইএমকে সেন্টারে সাংবাদিক বৈঠকে এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন ঘিরে কূটনীতিকদের এই শেষ মুহূর্তের তৎপরতা মূলত তিনটি বার্তা বহন করছে। প্রথমত, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার দিকে গভীরভাবে নজর রাখছে। দ্বিতীয়ত, তারা সব রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে পরিস্থিতি সম্পর্কে সরাসরি ধারণা নিতে চাইছেন। তৃতীয়ত, একটি শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের ওপর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছেÑ এমন ইঙ্গিতও এতে স্পষ্ট।

প্রচার শুরু হলেও সামনে সময় খুব বেশি নেই। এই সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মাঠের তৎপরতার পাশাপাশি কূটনৈতিক পর্যবেক্ষণ ও যোগাযোগ নির্বাচনের গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই কূটনীতিকদের এই সক্রিয়তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন মাত্রা যোগ করছে, যেখানে অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নজরদারিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com