মঙ্গলবার, ০৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৩:৪৯ অপরাহ্ন

নির্বাচনের ছায়ায় অপরাধের উত্থান

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১ বার

দরজায় কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। প্রচারের ডামাডোলে মাঠ সরগরম হলেও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অপরাধ। নিয়ন্ত্রণে নেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। খুন, চাঁদাবাজি, দখল আর রাজনৈতিক সংঘর্ষে উত্তপ্ত বিভিন্ন এলাকা। সুষ্ঠু ও নিরাপদ নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার শীর্ষ পর্যায়েও উদ্বেগের শেষ নেই। সরকারের ঘোষিত ‘ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ কার্যক্রমকে অনেকেই লোকদেখানো উদ্যোগ বলে মনে করছেন।

সম্প্রতি রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক মতবিনিময় সভায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, নির্বাচনে কাউকে আইন ভঙ্গ করতে দেওয়া হবে না। বেআইনি কাজে জড়িতদের কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনা হবে।

পরিসংখ্যানে ভয়াবহতা : চলতি বছরের জানুয়ারির প্রথম ২৫ দিনেই প্রতিদিন একাধিক খুনের ঘটনা ঘটেছে। খোদ পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের শেষ পাঁচ মাসে সারা দেশে ১ হাজার ৫৬৫টি খুন হয়েছে, গড়ে মাসে ৩১৩টি। ২০২৪ সালের তুলনায় খুন বেড়েছে ১৮ শতাংশ, ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ। এ ছাড়া ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত খুন ও দস্যুতা-সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ৪ হাজার ৩১৬টি, মাসে গড়ে ৫৪০টি।

গত ২৩ জানুয়ারি রাজধানীর কারওয়ান বাজারে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বির হত্যাকা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেছে। ডিবি পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় অন্তত আট থেকে নয়টি চাঁদাবাজি সিন্ডিকেট সক্রিয়। ২৬ জানুয়ারি পাবনার ভাঙ্গুড়ায় ১ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে একটি নির্মাণাধীন ভবন থেকে আটক করা হয় শ্রমিক নেতা মাসুদ রানা ও আবদুল মালেককে। পুলিশ জানায়, তারা দীর্ঘদিন ধরে দখল করা জমি বিক্রির সঙ্গে জড়িত। এর আগে জানুয়ারির শুরুতে কিশোরদের ছিনতাইয়ের ঘটনায় হাসিবুল ইসলামকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ২০ জানুয়ারি রাজধানীর পল্লবীতে বাবু নামের এক যুবকও খুন হন।

র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপস) কর্নেল ইফতেখার আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে র‌্যাবের প্রতিটি সদস্য নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে কাজ করছে। র‌্যাব কোনো অপরাধীকে তার অন্য কোনো পরিচয় দেখে বিবেচনা করে না। সহিংসতায় জড়িতদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

রাজনৈতিক সহিংসতায় উত্তপ্ত মাঠ : নির্বাচনি সহিংসতাও বাড়ছে উদ্বেগজনকভাবে। শেরপুরে প্রার্থীদের নির্বাচনি ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াত নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষে শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিম নিহত হন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন তফসিল ঘোষণার পর জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলেও, এরপর আরও তিনটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটে, পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যেই উঠে এসেছে বিষয়টি।

৪৫ দিনে ১৪৪ সহিংসতা : পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে, ১২ ডিসেম্বর থেকে ২৬ জানুয়ারি- ৪৫ দিনে সারা দেশের অন্তত ২৫টি জেলা ও তিনটি মহানগরে নির্বাচনি সহিংসতার ১৪৪টি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের সংঘর্ষ ৫৫টি, ভীতি প্রদর্শন ও আক্রমণাত্মক আচরণ ১১টি, প্রার্থীর ওপর সরাসরি হামলা ছয়টি এবং অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা দুটি। এ ছাড়া প্রচারণায় বাধা ১৭টি, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট অফিস ও প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুর আটটি, অবরোধ ও বিক্ষোভ ১০টি এবং সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার একটি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ সবচেয়ে বেশি কুমিল্লায়। চৌদ্দগ্রাম ও হোমনা উপজেলায় ধারাবাহিক সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হন। একাধিক ঘটনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী নামাতে হয়। লক্ষ্মীপুরেও চন্দ্রগঞ্জ ও সদর থানার বিভিন্ন এলাকায় জামায়াত ও বিএনপি নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। লিফলেট বিতরণ ও প্রচারণা ঘিরে এসব ঘটনায় উভয় পক্ষের নেতা-কর্মীরা আহত হন।

হুমকি ও ভীতি প্রদর্শন : নেত্রকোনার আটপাড়ায় সড়কের ওপর খড় দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে ‘ইলেকশন নির্মূল কমিটি’ লেখা চিরকুট ফেলে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। কক্সবাজারের উখিয়ায় বিএনপির প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরীর বাড়িতে ডাকযোগে কাফনের কাপড় ও হুমকি চিঠি পাঠানো হয়- নির্বাচনে অংশ নিলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, সংঘাতপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে। শুধু নোটিশ বা বিবৃতিতে সহিংসতা ঠেকানো সম্ভব নয়। তার মতে, গণতান্ত্রিক সহনশীলতার অভাব এবং প্রতিদ্বন্দ্বীকে শত্রু ভাবার মানসিকতাই নির্বাচনি সহিংসতার মূল কারণ।

দুই মাসে মব সন্ত্রাসে নিহত দ্বিগুণ : মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) এর তথ্য বলছে, গত বছরের ডিসেম্বরের তুলনায় চলতি বছরের জানুয়ারিতে গণপিটুনি বা মব সন্ত্রাসে নিহতের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। জানুয়ারিতে ২৮টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২১ জন। ডিসেম্বরে ২৪টি ঘটনায় নিহত ছিলেন ১০ জন। জানুয়ারিতে ৫৭টি অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার হয়েছে, ডিসেম্বরে ছিল ৪৮টি। কারা হেফাজতে মৃত্যুও বেড়েছে। ডিসেম্বরে নয়জন থেকে জানুয়ারিতে ১৫ জনে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক সহিংসতায় জানুয়ারিতে আহতের সংখ্যা ডিসেম্বরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। নিহতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে চারজন। এ ছাড়া জানুয়ারিতে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ১৫টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা ডিসেম্বরে ছিল চারটি।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com