

অতীতের মতোই সংস্কৃতিখাত উন্নয়নে নির্বাচনী ইশতেহারে পরিকল্পনা নিয়েছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোট। তবে রাজনৈতিক দলগুলো জনগণকে আকৃষ্ট করতে অনেক চমকপ্রদ কথা বললেও ইশতেহার বাস্তবায়নের আকাক্সক্ষা পোষণ করে না বলে অভিযোগ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের। তাই প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তি নয়, বরং তার বাস্তবায়ন চান তারা।
সংস্কৃতি শুধু বিনোদনের অনুষঙ্গ নয়; বরং জাতীয় পরিচয়, গণতন্ত্রচর্চা এবং সুস্থ ও মানবিক সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি বলে মনে করে বিএনপি। দলটির নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, সংস্কৃতি অঙ্গনের বিকাশ ছাড়া টেকসই গণতন্ত্র ও মুক্তচিন্তার সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তাই দেশের ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সংগীত, নৃত্য, নাটক, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রসহ সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখাকে আরও সমৃদ্ধ করার অঙ্গীকার করেছে দলটি। ইতিবাচক ও কল্যাণমুখী বৈশ্বিক সংস্কৃতিকে জাতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সমন্বয়ের কথাও ইশতেহারে তুলে ধরা হয়। শিশু-কিশোর তথা আবালবৃদ্ধবনিতার জন্য তাদের সাংস্কৃতিক পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়।
এদিকে জামায়াতও সংস্কৃতির উন্নয়নে বড় পরিকল্পনা দিয়েছে। তবে তারা শিল্পের বিভিন্ন অংশকে আলাদাভাবে (যেমনÑ গান, নাটক, নাচ ও চিত্রকলা) উল্লেখ করেনি। তারা ইশতেহারে সাংস্কৃতিক নীতি প্রণয়ন, দেশীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সংস্কৃতি বিনিময় ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিক বোদ্ধা ও সাংস্কৃতিক গবেষকদের নিয়ে একটি জাতীয় সাংস্কৃতিক কমিশন গঠনের কথা উল্লেখ করেন। এছাড়া সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন ২১টি দপ্তর বা সংস্থার মানোন্নয়ন, যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও গতিশীল করার ক্ষেত্রে একটি বিশেষজ্ঞ টিম গঠন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এনসিপি শিল্প ও সংস্কৃতি বলতে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে জোর দিয়েছে। বিনোদন বলতে বিশ্বের বড় বড় শহরে বর্ষবরণ ও নবান্ন উৎসব উন্মুক্ত স্থানে আন্তর্জাতিক পরিসরে উদযাপন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এমনিভাবে এবি পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ও গণসংহতি আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ছোট পরিসরে সংস্কৃতি ভাবনার কথা বলেছে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও বাংলাদেশ জাসদসহ ৯টি দল নিয়ে গঠিত গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট ইশতেহারে মত প্রকাশ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর সব বাধা প্রত্যাহার, শিল্পী, লেখক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এছাড়া সাহিত্য, নাটক, সংগীত, চলচ্চিত্র ও লোকজ সংস্কৃতির রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা; প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে বিশেষ উদ্যোগ; এবং গণতান্ত্রিক, মানবিক ও প্রগতিশীল মূল্যবোধ বিকাশে সাংস্কৃতিক নীতি প্রণয়ন, ইতিহাস বিকৃতি ও সাম্প্রদায়িক অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে সুস্থ ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলন জোরদার করার কথা বলেছে।
প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে লিখব
এ বিষয়ে জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হান আমাদের সময়কে বলেন, আমার প্রথম কবিতার বই ‘জ্বলে উঠি সাহসী মানুষ’-এ ‘সাহসী মানুষ চাই’ কবিতায় লিখেছিলামÑ‘আমাদের অশিক্ষিত নেতারা সংস্কৃতি বোঝে না, বরং নির্বাচন ভালো বোঝে।’ এই বাস্তবতা আজও বদলায়নি। আমরা কবি-লেখকরা কোনো দলের ক্ষমতার ভাগ চাই না, কোনো দলের ইশতেহার বাস্তবায়নের দায়িত্বও নিতে চাই না। আমরা চাই জনগণের স্বার্থ, লেখার স্বাধীনতা, কলমের স্বাধীনতা। যে রাজনৈতিক শক্তি আমাদের কথা বলার অধিকার নিশ্চিত করবে ও সমালোচনার অধিকার দেবে-আমরা তাদের পক্ষেই থাকব। যারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবে, তাদের বিরুদ্ধে আমরা আবার লিখব, আন্দোলন করব।
গীতিকবি শহীদুল্লাহ ফরায়জী বলেন, দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলো, জনগণকে আকৃষ্ট করার জন্য অনেক চমকপ্রদ কথা বলে, কিন্তু ইশতেহারকে নৈতিকভাবে বাস্তবায়নের আকাক্সক্ষা পোষণ করে না। ফলে ইশতেহার শুধু ঘোষণার বিষয়ে দাঁড়ায়, বাস্তবায়নের বিষয় দাঁড়ায় না।