শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১২:০৭ পূর্বাহ্ন

বকেয়া আদায় না হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে হুমকি

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ২৩ বার

গত বছরের জুনে যেখানে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া পাওনা ছিল প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা, সেখানে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকায়। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) কাছে দেশীয় ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর বকেয়া পাওনার এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে বিল পরিশোধ না করে বকেয়া জমিয়ে রেখেছে। তাদের ধারণা, বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেশি দেখানো এবং নির্বাচনপরবর্তী সরকারের সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এক ধরনের বিরূপ সম্পর্ক তৈরির উদ্দেশ্যেই এমনটি করা হতে পারে।

বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন (বিপপা) জানিয়েছে, বর্তমানে এসব কেন্দ্রের মোট পাওনা প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা, যা অনেক ক্ষেত্রে ৮ থেকে ১০ মাস ধরে পরিশোধ হয়নি। দীর্ঘদিন বিল বকেয়া থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলো তীব্র আর্থিক সংকটে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে রমজান মাসের আগেই মোট বকেয়ার অন্তত ৬০ শতাংশ পরিশোধের দাবি জানিয়েছে তারা। তা না হলে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়বে বলেও সতর্ক করেছেন মালিকরা।

গতকাল সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন বিপপা নেতারা। এতে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির সভাপতি ডেভিড হাসনাত, সাবেক সভাপতি ইমরান করিম, পরিচালক নাভিদুল হক ও ফয়সাল আহমেদ চৌধুরী।

লিখিত বক্তব্যে ইমরান করিম বলেন, দীর্ঘদিন বকেয়া থাকার ফলে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের অস্থিরতা ও ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের চাপ মিলিয়ে বিদ্যুৎ

উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান দৈনন্দিন ব্যয় ও জ্বালানি আমদানির অর্থ জোগাতে উচ্চ সুদে ব্যাংকঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে, যা তাদের আর্থিক সক্ষমতা আরও দুর্বল করে দিচ্ছে।

বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে বিপিডিবি বিল পরিশোধে ব্যর্থ হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থগিত রাখার আইনগত অধিকার রয়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর। চুক্তির ১৩.২ (জ) ধারা অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে বিপিডিবির বিদ্যুৎ গ্রহণের অধিকারও স্থগিত হতে পারে। তবে জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করে দেশীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কখনোই পূর্ণমাত্রায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করেনি। বিপুল বকেয়া সত্ত্বেও তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু রেখেছে।

সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, বকেয়ার কারণে উৎপাদন সীমিত করতে বাধ্য হলে জাতীয় লোড বণ্টন কেন্দ্র বাস্তব চাহিদার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ চাহিদা দেখিয়ে ক্ষতিপূরণমূলক জরিমানার (লিকুইডেটেড ড্যামেজ) পরিমাণ বাড়িয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, কাগজে-কলমে বিপিডিবির বকেয়া কম দেখানোর উদ্দেশ্যেই এই জরিমানা আরোপ করা হচ্ছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে বকেয়া বিল থেকে জরিমানার অর্থ কর্তন করা হয়েছে, অন্যদের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া চলমান।

বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের মতে, এই তথাকথিত জরিমানার মূল কারণ বিপিডিবির দীর্ঘদিনের বিল পরিশোধে ব্যর্থতা, যার দায় অন্যায়ভাবে তাদের ওপর চাপানো হচ্ছে। তারা সতর্ক করে বলেন, এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হতে পারে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি আমদানি ও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে বৈষম্যের অভিযোগও তোলা হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের দাবি, একই ধরনের চুক্তি থাকা সত্ত্বেও আদানি ও চীনা মালিকানাধীন বরিশাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে এলডি বা জরিমানা আরোপ করা হচ্ছে না, অথবা আরোপ করা হলেও পরে তা ফেরত দেওয়া হচ্ছে। একই আইন ও চুক্তি কাঠামোর ভিন্ন প্রয়োগ নিয়ে তারা গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

বিপপা জানায়, প্রায় ৩০টি এইচএফওভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এলডি কর্তনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে সালিশ আবেদন করেছিল। তবে চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি সেই আবেদন খারিজ করে বিপিডিবির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পরামর্শ দেওয়া হয়। সালিশ ও পুনর্বিবেচনার প্রক্রিয়া চলমান থাকা সত্ত্বেও জরিমানা কর্তন অব্যাহত থাকায় চুক্তির ন্যায়সঙ্গততা ও বিদ্যুৎ খাতের স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সভাপতি ডেভিড হাসনাত বলেন, ‘বকেয়ার টাকা না পেলে জ্বালানি তেল আমদানি করা সম্ভব হবে না। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোও কঠিন হয়ে পড়বে। আসন্ন গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে। পর্যাপ্ত উৎপাদন না হলে লোডশেডিং অনিবার্য হবে। তাই রমজানের আগেই অন্তত ৬০ শতাংশ বকেয়া পরিশোধের ব্যবস্থা করা জরুরি।’

এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বর্তমান ও আসন্ন নির্বাচিত সরকারের জন্য একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com