

ঈদুল ফিতর মানেই আনন্দ। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটানো আর নানারকম সুস্বাদু খাবারের আয়োজনে খাবার টেবিল হয়ে ওঠে উৎসবের কেন্দ্র। তবে যারা ঈদ ও ঈদ-পরবর্তী দিনগুলোতেও খাবারের বিষয় একটু সচেতন থাকতে চান, পাশাপাশি শরীর সুস্থ ও ফিট রেখে উৎসবের খাবার উপভোগ করতে চান, তাদের জন্য সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডায়েটিশিয়ান, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক নেটওয়ার্ক-বিডিএন-এর পুষ্টিবিদ নাজিয়া আফরিনের পরামর্শে
হেলদি ডায়েট সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছেন- রিয়ানা ইসলাম রিম্পা
সকাল শুরু হোক পুষ্টিকর খাবারে
ঈদ ও ঈদ-পরবর্তী কয়েকদিন অনেকেই নিয়ম ভেঙে বেশি খেয়ে ফেলেন। এ বিষয়ে পুষ্টিবিদ নাজিয়া আফরিন বলেন, দীর্ঘ এক মাস রোজা রাখার পর হঠাৎ করে যখন অনেক ভারী তৈলাক্ত খাবার, অতিরিক্ত পরিমাণে প্রোটিন বা মিষ্টিজাতীয় খাবার গ্রহণ করা হয় তখন তা শরীরের জন্য স্বস্তিদায়ক হয় না। তাই অল্প অল্প করে কিছুক্ষণ পরপর খাবার খাওয়া উচিত। আসলে একটু পরিকল্পনা করে খাবার খেলে উৎসবের আনন্দও পাওয়া যায়, আবার শরীরও ভালো রাখা সম্ভব। ঈদের দিন সকালে অনেকেই শুধু মিষ্টিজাতীয় খাবার খেয়ে দিন শুরু করেন। কিন্তু এতে শরীরে অতিরিক্ত চিনি প্রবেশ করে এবং দ্রুত ক্লান্তি বা ক্ষুধা লাগতে পারে। তাই দিনের শুরুতে পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়াই ভালো। পুষ্টিবিদের মতে, ‘সকালটা অবশ্যই ভারী খাবার দিয়ে শুরু করতে হবে। যেমনÑ সেমাই খেলে তার সঙ্গে মুড়ি বা খই থাকা জরুরি। খিচুড়ি-মাংস, ভাত-ডিম, রুটি বা পরোটা- চিকেন হতে পারে। তারপর সকাল ও দুপুরের মাঝামাঝি মিড মর্নিংয়ে ১১টার দিকে ফল, দই, ওটস বা ডিমের মতো খাবার গ্রহণের ফলে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টির পাশাপাশি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত শক্তি ধরে রাখবে। সঙ্গে এক গ্লাস গরম পানি বা উষ্ণ গরম পানি লেবু বা টক দই দিয়ে পান করাও শরীরের জন্য ভালো। এতে হজম প্রক্রিয়াও স্বাভাবিক থাকে।’
বৈচিত্র্যপূর্ণ খাবারের থালা
ঈদের টেবিলে নানা ধরনের খাবার থাকে, একসঙ্গে বেশি পরিমাণে ভারী খাবার খেলে শরীরে অস্বস্তি হতে পারে। তাই পুষ্টিবিদের পরামর্শÑ ‘একবারে অনেক বেশি না খেয়ে অল্প অল্প করে কয়েকবার খাওয়াই ভালো। এতে সহজে হজম হয় এবং শরীরে অস্বস্তির সৃষ্টি করে না।’ বিশেষ করে পোলাও, বিরিয়ানি বা কোরমার মতো ভারী তৈলাক্ত খাবার খাওয়ার সময় খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ রাখা জরুরি। প্লেটের অর্ধেকটা সবজি বা সালাদ দিয়ে পূরণ করলে খাবারের ভারসাম্য বজায় থাকে।
পানির গুরুত্ব ভুলে গেলে চলবে না
এক মাস সিয়াম সাধনার পর শরীরে পানির ঘাটতি হতে পারে। এ ছাড়া ঈদের ব্যস্ততা ও অতিথি আপ্যায়নের মাঝে অনেক সময় আমরা পর্যাপ্ত পানি পান করতে ভুলে যাই। কিন্তু শরীর সুস্থ রাখতে পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুষ্টিবিদ নাজিয়া আফরিনের মতে, ওজন, উচ্চতা ও বয়স অনুযায়ী দিনে অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি পান করা উচিত। বেশি মিষ্টি বা ভাজাপোড়া খাবার খেলে শরীরে পানির প্রয়োজন আরও বেড়ে যায়। তাই নিয়মিত পানি পান করলে শরীর সতেজ থাকে এবং হজমেও সাহায্য করে।
মিষ্টি খাবারেও চাই সচেতনতা
ঈদ মানেই সেমাই, পায়েস, মিষ্টি বা নানা ধরনের ডেজার্ট। এগুলো ছাড়া ঈদের আনন্দ যেন পূর্ণতা পায় না। তবে অতিরিক্ত মিষ্টি খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যেতে পারে এবং শরীর ভারী লাগতে পারে। পুষ্টিবিদ নাজিয়া আফরিন পরামর্শ দেন, মিষ্টি পুরোপুরি বাদ না দিয়ে পরিমাণে সীমিত রাখা ভালো। যেমনÑ একসঙ্গে অনেক ধরনের মিষ্টি না খেয়ে একটি বা দুটি বেছে খাওয়া যেতে পারে। চাইলে কম চিনি দিয়ে তৈরি ডেজার্টও বেছে নেওয়া যেতে পারে।
হালকা হাঁটায় সচল শরীর
ঈদের দিনগুলোতে অনেক সময়ই খাওয়া-দাওয়া আর আড্ডায় কাটে। ফলে শরীরের নড়াচড়া কমে যায়। কিন্তু খাবারের পর সামান্য হাঁটাহাঁটি করলে শরীর হালকা থাকে এবং হজম ভালো হয়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভারী খাবার খাওয়ার পর অন্তত ১০-১৫ মিনিট হাঁটা শরীরের জন্য উপকারী। এতে ক্যালোরি ব্যালান্স বজায় থাকে এবং অলসতাও কমে যায়।
আনন্দের মাঝেও স্বাস্থ্যসচেতনতা
একটু সচেতনতা ও ভারসাম্য বজায় রাখলেই উৎসবের আনন্দ উপভোগ করা সম্ভব। পুষ্টিবিদ নাজিয়া আফরিনের ভাষায়, ‘ঈদের খাবার উপভোগ করুন, তবে শরীরের প্রয়োজনের কথাও মনে রাখুন। পরিমিত খাবার, পর্যাপ্ত পানি এবং সামান্য শারীরিক নাড়াচাড়াÑ এই তিনটি বিষয় মেনে চললেই ঈদের দিনগুলো স্বাস্থ্যকরভাবে কাটানো সম্ভব।’ উৎসবের আনন্দের সঙ্গে যদি স্বাস্থ্যকর অভ্যাসও যুক্ত হয়, তাহলে ঈদের দিনগুলো শুধু আনন্দময়ই নয়, সুস্থ ও প্রাণবন্তও হয়ে উঠবে।