

শুধু সৌদি আরব কেন, পাকিস্তান ও তুরস্কের এই জোটে সামিল হওয়া এবং এই চুক্তির মাধ্যমে চুক্তিভুক্ত যেকোনো দেশের ওপর হামলাকে পুরো জোটের ওপর হামলা বলে বিবেচিত হওয়ার মতো সিদ্ধান্তকে বিশ্লেষকরা একে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ বলে আখ্যায়িত করছেন। প্রশ্ন আসতে পারে, কেন এই তিন দেশের একত্র হওয়া? এর উত্তরে এই মুহূর্তে একটিই জবাব, আর তা হচ্ছে এর মধ্য দিয়ে দেশগুলোর মধ্যে অভিন্ন স্বার্থের অন্বেষণ করা।তবে এখানে সবচেয়ে বড় যে ভুলটি ডোনাল্ড ট্রাম্প করে বসেছেন, সেটি হচ্ছে অতীতের প্রেসিডেন্টদের মতো ধীরে চলো নীতিকে পরিহার করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিকে এককভাবে জাহির করতে যাওয়া। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির তুলনায় অনেক দুর্বল ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিনিয়ত নাজেহাল হতে হচ্ছে। ক্ষমতালোভী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে ট্রাম্পের এই ক্ষমতার দম্ভের সঙ্গে তাই খুব সহজেই এক করে ফেলা সম্ভব হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইরান যুদ্ধের বৈধতার পক্ষে এই মুহূর্তে কোনো ধরনের যুক্তি দেখানো যাচ্ছে না। গত এক বছরের বেশি সময় ধরে ইরান নিয়ে উত্তেজনা এবং এক পর্যায়ে ইসরায়েলকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার নেপথ্য কারণ হিসেবে ইরানকে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ এবং সেখানকার শাসক পরিবর্তন বলা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে এটি এসে ঠেকেছে হরমুজ প্রণালির অবরোধ প্রত্যাহার করা না করার বিষয়ে। বৈশ্বিক পরিসরে একক রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের এতটা গুরুত্ব পাওয়া আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শক্তির ভারসাম্যের প্রতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের এতদিনকার মিত্র ইউরোপের দেশগুলো, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও জাপানের মতো দেশগুলোও এখন নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে বিকল্প খুঁজতে চাইছে। ব্রিকসে এবং সাংহাই কো-অপারেটিভ অর্গানাইজেশনের (এসসিও) নতুন তৎপরতা, সেই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে চীনের দূরত্ব কমিয়ে আনতে দুই দেশের পক্ষ থেকেই আলোচনা, ইউরোপের সঙ্গে চীনের এবং চীনের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সম্পর্ককে ঝালাই করতে নতুন অনেক তৎপরতা লক্ষণীয় হচ্ছে।
এত কিছুর পরও মক্কা চুক্তি বাস্তবে কতটুকু তাদের আশার প্রতিফলন ঘটাবে, এটি নিয়েও সংশয় থেকে যায়। ডোনাল্ড ট্রাম্প এই মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর সৌদি আরব ও আরব আমিরাতে তার দ্বিপক্ষীয় সফরে দুটি দেশের সঙ্গেই বিশাল অঙ্কের বাণিজ্যচুক্তি করেন। তবে এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে যে সৌদি আরব ও আমিরাত—এই দুটি দেশ মধ্যপ্রাচ্যের মৌলিক ইস্যু ইসরায়েল নিয়ে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে রয়েছে। ২০২০ সালে আব্রাহাম চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে আমিরাত ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিলেও এত দিন ধরে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে নতি স্বীকার করেনি সৌদি আরব। অন্যদিকে অনেক বিতর্ক নিয়েও সৌদি আরবের রাজতন্ত্র টিকে থাকার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের বিষয়টিও কারো অজানা নয়। পাকিস্তানে ইমরান খান পতনের পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনের সমন্বয়ে শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হওয়ার নেপথ্যে মূল সহায়ক শক্তি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের সঙ্গে সৌদি আরবের সমস্যার মূল কারণও হচ্ছে সেখানে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি, যা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যুদ্ধে ইরানের অন্যতম লক্ষ্যবস্তু। এ ক্ষেত্রে আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারের মতো দেশগুলোর অবস্থান ইরানের কাছে একই রকম। তবে বর্তমান বাস্তবতা উপলব্ধি করে যদি যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধের অবসান ঘটায়, তবে পরিস্থিতি একই রকম না-ও থাকতে পারে। মক্কা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর ইরানপন্থী ইয়েমেনের হুতিরা লোহিত সাগরের কাছে সৌদি আরবের তেল শোধনাগারে হামলা চালালেও এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী অপরাপর দেশ সৌদির সমর্থনে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি, যা এই চুক্তির একটি দুর্বলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে এই চুক্তিকে সবল বা দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত করাকে খুব একটা সমীচীন মনে করা ঠিক হবে না। একটি জোটের সবেমাত্র যাত্রা শুরু হলো, যার পেছনে সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য এবং কর্মপরিকল্পনা রয়েছে। এখানে তাদের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ক্ষোভ থাকলেও এই দেশগুলোর কোনোটিই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের স্বার্থের কারণে চূড়ান্তভাবে সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে চাইবে না। যুক্তরাষ্ট্রকে বরং এটি উপলব্ধি করাতে এটি একটি বার্তা যে তাদের নীতিকে সংশোধন করে তারা সঠিক পথ অবলম্বন করুক। চুক্তিভুক্ত দেশগুলো এবং এ রকম অনেক দেশের জন্যই ইসরায়েল এক বড় ধরনের ভীতি। সামনের দিনগুলোতে মিসর এই চুক্তির অংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমনও হতে পারে, ইরান যুদ্ধের অবসানের পর ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জোটগত অবস্থানকে শক্তিশালী করতে ইরানকেও এর অংশ করা হতে পারে। আসলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো কিছুই নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। তবে এই মুহূর্তে বলা যায় যে মক্কা চুক্তিটি ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য একটি বড় বার্তা।
লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়