যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগোর একটি মসজিদে চলতি বছরের ভয়াবহ বন্দুক হামলার ঘটনায় উত্তর ক্যারোলিনার ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরীর বিরুদ্ধে তিনটি হত্যা ও একটি ষড়যন্ত্রের অভিযোগে মামলা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, হামলার ভিডিও সরাসরি সম্প্রচার এবং হামলাকারীদের লেখা বা কথিত ম্যানিফেস্টো প্রকাশে সহযোগিতা করার পরিকল্পনায় ওই কিশোরী আগে থেকেই যুক্ত ছিলেন।
ফরসাইথ কাউন্টির ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি জিম ও’নিল জানান, গ্র্যান্ড জুরি ওই কিশোরীর বিরুদ্ধে প্রথম-ডিগ্রি হত্যার তিনটি অভিযোগ এবং প্রথম-ডিগ্রি হত্যা সংঘটনের ষড়যন্ত্রের একটি অভিযোগ অনুমোদন করেছে। মামলার নথিতে আসামির নাম সারা সান্তিয়াগো হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে ও’নিল বলেন, উত্তর ক্যারোলিনার আইনে কোনো ব্যক্তি নিজ হাতে অপরাধের সব কাজ না করলেও, অপরাধ সংঘটনে সহায়তা বা পরিকল্পনায় জড়িত থাকার প্রমাণ থাকলে তাকে অপরাধের জন্য দায়ী করা যেতে পারে।
তবে সান্তিয়াগোর আইনজীবী অ্যালান দোরাসামি তার মক্কেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি জানান, সান্তিয়াগো অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং তদন্তের নথিপত্র পুরোপুরি হাতে না পাওয়ায় তিনি মামলার প্রমাণ নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে পারছেন না। তবে তার ভাষ্য, তার মক্কেল এসব অভিযোগে নির্দোষ।
মসজিদে হামলায় তিনজন নিহত
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ১৮ মে ২০২৬ সান দিয়েগোর ইসলামিক সেন্টারে হামলা চালায় ১৭ বছর বয়সী কেইন ক্লার্ক এবং ১৮ বছর বয়সী ক্যালেব ভাসকেজ। হামলার পর দুজনই আত্মহত্যা করে মারা যায়।
হামলায় আমিন আবদুল্লাহ, নাদির আওয়াদ ও মনসুর কাজিহা নিহত হন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, হামলার আগেই সান্তিয়াগো হামলাকারীদের সঙ্গে হামলার ভিডিও সরাসরি সম্প্রচার, সেই ভিডিও প্রকাশ্যে ছড়িয়ে দেওয়া এবং হামলাকে ন্যায্যতা দেওয়ার দাবি করা একটি ম্যানিফেস্টো প্রকাশের বিষয়ে পরিকল্পনা ও সম্মতিতে যুক্ত ছিলেন। প্রসিকিউটরদের দাবি, হামলার পর তিনি এসব কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নও করেন।
হামলাকারীকে নব্য-নাৎসি প্রতীক পাঠানোর অভিযোগ
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, হামলার আগে সান্তিয়াগো ভাসকেজকে একটি সনেনরাড প্রতীকযুক্ত প্যাচ কিনে পাঠিয়েছিলেন এবং হামলার সময় ভাসকেজ সেটি পরেছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
সনেনরাডকে নব্য-নাৎসি ও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত একটি ঘৃণার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
উত্তর ক্যারোলিনার এফবিআই কার্যালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা রেইড ডেভিস বলেন, প্রযুক্তির আড়ালে থেকে কেউ অপরাধের দায় এড়াতে পারবে না। মানুষের জীবন ঝুঁকিতে ফেললে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সব ধরনের ক্ষমতা ব্যবহার করবে।
৩০টির বেশি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার
তদন্তের অংশ হিসেবে তিনটি বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে ৩০টির বেশি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে ছিল বিভিন্ন ধরনের পিস্তল, রাইফেল ও শটগান। এছাড়া একটি ক্রসবো, কৌশলগত সরঞ্জাম, বিপুল পরিমাণ গুলি এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইসও উদ্ধার করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের দাবি, হামলাকারীদের মধ্যে উগ্রপন্থী মতাদর্শের আদান-প্রদান হয়েছিল। পুলিশ উদ্ধার করা কথিত ম্যানিফেস্টোতে বিভিন্ন জাতি ও ধর্ম নিয়ে উগ্র বক্তব্য এবং ঘৃণাত্মক ভাষার সন্ধান পেয়েছে। হামলায় ব্যবহৃত একটি অস্ত্রেও ঘৃণাত্মক বক্তব্য লেখা ছিল বলে কর্মকর্তারা জানান। হামলাকারীদের একজনের রেখে যাওয়া আত্মহত্যার নোটেও জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে লেখা ছিল বলে জানানো হয়েছে।
হামলার আগে থেকেই অস্ত্র ও আচরণ নিয়ে উদ্বেগ
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ভাসকেজ হামলার আগের দিন পর্যন্ত একটি মানসিক স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে ছিলেন। এর আগে তার সন্দেহজনক আচরণ এবং নাৎসি ও গণহত্যাকারীদের প্রতি তার আগ্রহ নিয়ে উদ্বেগের কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার পরিবারের বাড়িতে থাকা আগ্নেয়াস্ত্র জব্দের জন্য একটি জরুরি বন্দুক-সহিংসতা প্রতিরোধ আদেশও জারি করেছিল।
হামলার আগে ভাসকেজের মা পুলিশকে ফোন করেন। তিনি তার ছেলের লেখা একটি কথিত আত্মহত্যার নোট খুঁজে পাওয়ার পর পুলিশকে জানান। তার ছেলে অনলাইনে পরিচিত এক ব্যক্তির সঙ্গে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল এবং দুজনই সামরিক ধাঁচের পোশাক পরেছিল। বাড়ি থেকে কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্রও নিখোঁজ ছিল বলে জানা যায়।
আরও দুটি স্থানে হামলার পরিকল্পনা ছিল
তদন্তকারীদের দাবি, মসজিদে হামলার পর হামলাকারীরা শহরের একটি ইহুদি উপাসনালয় এবং প্রধানত আফ্রিকান-আমেরিকান শিক্ষার্থী অধ্যুষিত একটি স্কুলে গণহত্যা চালানোর পরিকল্পনাও করেছিল।
তবে মসজিদে হামলার সময় একজন সশস্ত্র নিরাপত্তাকর্মীর গুলিতে হামলাকারীদের একজন আহত হওয়ার পর সেই পরিকল্পনা থেমে যেতে পারে বলে ধারণা করছেন তদন্তকারীরা।
নিহতদের সাহসিকতার প্রশংসা
হামলার সময় নিহত তিনজনের সাহসিকতারও প্রশংসা করেছেন কর্মকর্তারা।
নিরাপত্তারক্ষী আমিন আবদুল্লাহ হামলাকারীদের দিকে গুলি চালিয়ে মসজিদকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছিলেন। পরে হামলাকারীরাও পাল্টা গুলি চালায়।
অন্যদিকে মনসুর কাজিহা ও নাদির আওয়াদ হামলাকারীদের দৃষ্টি মসজিদ থেকে সরিয়ে পার্কিং এলাকার দিকে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে কর্মকর্তারা জানান। সেই সময় তারা হামলাকারীদের গুলিতে নিহত হন।
হামলার আগে ইসলামিক সেন্টার কর্তৃপক্ষও নিরাপত্তা জোরদার করেছিল। বিভিন্ন বিদ্বেষপূর্ণ বার্তা ও হুমকি পাওয়ার পর সেখানে নিরাপত্তা বেড়া, বুলেটপ্রুফ জানালা এবং নিয়মিত হামলা মোকাবিলার মহড়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
সান্তিয়াগোকে গত সপ্তাহে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে সোমবার গ্র্যান্ড জুরি তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ অনুমোদন করে। প্রসিকিউটরদের বক্তব্য, বিষয়টি নিয়ে আরও অপেক্ষা করা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল এবং তাকে আবার স্কুলে ফেরত পাঠানোর বিষয়টিও কর্তৃপক্ষের কাছে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
তবে মামলাটি এখনও বিচারাধীন এবং সান্তিয়াগোর আইনজীবী তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে তাকে নির্দোষ দাবি করেছেন।
এ জাতীয় আরো খবর..