

আজ বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে দিবসটি। এবারের প্রতিপাদ্য ‘জীবনের কথা শুনি, বাস্তব পরিবর্তন আনি’। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রতিপাদ্য ‘লিভড এক্সপেরিয়েন্সেস হার্ড : রিয়েল ভয়েসেস, রিয়েল চেঞ্জ’। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ-২০১৯ অনুযায়ী দেশের প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে ১৮.৭ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের মধ্যে ১২.৬ শতাংশ মানসিক রোগে আক্রান্ত। আর জেরিয়াট্রিক এজ গ্রুপে অর্থাৎ ৬০ বছরের বেশি বয়সের ব্যক্তিদের মধ্যে এই হার প্রায় ২৮ শতাংশ।
মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষের নিজস্ব অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে নীতি, সেবা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের সম্পৃক্ত করার ওপর এবার বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দিবসটি উপলক্ষে এক বাণীতে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি সহমর্মিতা ও সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি তাদের যথাযথ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পরিবার ও সমাজের সহায়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
বাণীতে রাষ্ট্রপতি দেশের সব নাগরিকের সার্বিক মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য মানুষের সার্বিক সুস্থতা, কর্মক্ষমতা ও জীবনমানের একটি অপরিহার্য অংশ। পরিবর্তিত বিশ্বপরিস্থিতি, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সামাজিক অস্থিরতা, একাকিত্ব, মাদকাসক্তি, পারিবারিক ও কর্মক্ষেত্রের চাপ এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা প্রতিকূলতা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। তাই শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক সুস্থতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করতে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী গত জুলাইয়ে জাতীয় সংসদে জানান, প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকায় টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ মনোরোগ চিকিৎসকের পরামর্শ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা একীভূত করার বিভিন্ন কর্মসূচি চলছে।
সরকারের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি গবেষণা, চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের প্রশিক্ষণ এবং তৃণমূল পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের মধ্যে ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন, মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্বাসন এবং মানসিক ও আচরণগত রোগ নিয়ে গবেষণাও রয়েছে।
‘বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস’ উপলক্ষে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফুন নাহার বলেন, একজন ব্যক্তিকে তার নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে হবে। সুস্থ জীবনধারায় অভ্যস্ত হতে হবে। রাতে পর্যাপ্ত ঘুমানো, পরিমিত পানি পান ও সুষম খাবার খাওয়া জরুরি। জীবনে সমস্যা আসবেই, সেগুলো সমাধান করার দক্ষতা তৈরি করতে হবে; যেমন স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট ও অ্যাঙ্গার ম্যানেজমেন্ট স্কিল অর্জন করতে হবে। কোনো মানসিক বা শারীরিক সমস্যা দেখা দিলে প্রথম অবস্থায় চিকিৎসা করাতে হবে। প্রবলেম ফোকাসড না হয়ে সলিউশন ফোকাসড ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগোতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও জরুরি। ভয়, লজ্জা, কুসংস্কার ও বৈষম্যের কারণে অনেকেই সমস্যার কথা প্রকাশ করেন না এবং চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করেন। ফলে রোগ জটিল হওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তি ও পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
এবারের প্রতিপাদ্যে তাই শুধু মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের কথা শোনার ওপর নয়, তাদের অভিজ্ঞতাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।