

জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা অর্থনীতিতে পরিণত হবে এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাবে।
বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার দীর্ঘ ঐতিহাসিক কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করা এবং আগামী তিন থেকে পাঁচ দশকের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের রূপরেখা তুলে ধরতে জাপানের রাজধানী টোকিওতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘বাংলাদেশ-জাপান ইকোনমিক ফোরাম ডায়ালগ’।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) টোকিওতে জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তথ্যটি নিশ্চিত করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা কাজে লাগাতে জাপানি বিনিয়োগকারীদের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা
বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (EPA)
দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সম্প্রতি বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (EPA) স্বাক্ষরিত হয়েছে।
নতুন অর্থনৈতিক সহযোগিতা কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৩৭টি পণ্য জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাচ্ছে। একই সঙ্গে জাপানি পণ্যও বাংলাদেশে বিশেষ সুবিধা ভোগ করবে। এ চুক্তি দুই দেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং পারস্পরিক বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জাপানি বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ নিরসনে অগ্রাধিকার
জাপানি ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের তিনটি প্রধান উদ্বেগ- নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষ অবকাঠামো এবং সহজ কাস্টমস ও কর প্রক্রিয়া- দ্রুত সমাধানে বর্তমান সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং ব্যবসা পরিচালনার প্রতিবন্ধকতা দূর করার মাধ্যমে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চল ও তিন অগ্রাধিকার খাত
প্রধানমন্ত্রী জানান, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে অবস্থিত জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চলে ইতোমধ্যে জাপানি মোটরগাড়ি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ও বড় বড় খুচরা বিক্রেতারা কারখানা স্থাপন শুরু করেছে।
ভবিষ্যতে দুই দেশের যৌথ সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণে তিনি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খাতের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন।
১. জ্বালানি খাত: দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে জাপানি বিনিয়োগের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
২. প্রযুক্তি ও মহাকাশ সহযোগিতা: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং ও রোবোটিকসনির্ভর ‘বাংলাদেশ-জাপান টেকনোলজি পার্ক’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি মহাকাশবিজ্ঞান ও উপগ্রহ প্রকৌশলে দুই দেশের মধ্যে যৌথ সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
৩. উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা: দেশের ছয়টি প্রধান বিভাগীয় শহরকে সংযুক্ত করতে দেশব্যাপী এলিভেটেড হাইওয়ে এবং উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্কের মাস্টারপ্ল্যান তৈরিতে জাপানের সহযোগিতা কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
দক্ষ মানবসম্পদ ও জাপানি ভাষা শিক্ষায় গুরুত্ব
বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে বাংলাদেশি তরুণদের জাপানি ভাষায় দক্ষ করে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এ উদ্যোগ ভবিষ্যতে দুই দেশের ব্যবসায়িক যোগাযোগ, কর্মসংস্থান ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জাপানকে বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে অভিহিত প্রধানমন্ত্রীর
বক্তব্যের শুরুতে ও শেষে জাপানি ভাষায় শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানকে বাংলাদেশের পরীক্ষিত ও বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে অভিহিত করেন।
তিনি নতুন শিল্প স্থাপন, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের নতুন দিগন্ত উন্মোচনে জাপানি বিনিয়োগকারীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ সহযোগিতা, বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র এবং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।