

রাজধানীর মগবাজারের ওয়্যারলেস গেট এলাকায় রাখি নীড় নামে একটি তিনতলা ভবনে ভয়াবহ বিস্ফোরণের কারণ অনুসন্ধানে একাধিক কমিটি গঠন করেছে আলাদা আলাদা কর্তৃপক্ষ। এসব কমিটির মধ্যে রয়েছে- পুলিশ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্যান্য বাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, বিস্ফোরক অধিদপ্তর, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিসহ অন্যরা।
এর আগেও একাধিকবার দেশের বিভিন্ন জায়গায় তিতাস গ্যাসের লিকেজ বা এলপিজি সিলিন্ডারের কারণে এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে। তাই মগবাজারের ঘটনা নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগের তীর ছিল তিতাসের দিকেই। তাই গত ২৭ জুনের ওই ঘটনার পর পরই তিতাস তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন তিতাসের ভিজিল্যান্স ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম চৌধুরী, সদস্য প্রকৌশলী সত্যজিৎ ঘোষ উপমহাব্যবস্থাপক মেঢাবিবি-৩ ও সদস্য সচিব প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন উপমহাব্যবস্থাপক জরুরি গ্যাস নিয়ন্ত্রণ বিভাগ। ঘটনা তদন্ত শেষে কমিটি তিতাসে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, লিকেজ বা তিতাসের গ্যাসের কারণে মগবাজারের ওই বিস্ফোরণ হয়নি। তিনতলা ভবনটিতে থাকা শর্মা হাউস নামে দোকানে যে গ্যাস রাইজার ছিল, সেটি অকার্যকর বা ডেথ রাইজার। সেখানে কোনো গ্যাস ছিল না। তবু কমিটির সদস্যরা রাইজার চেক করে দেখেছেন, ঘটনার সময় এর লক উইং কক (ভাল্ব) বন্ধ ছিল। তাই বিস্ফোরণের ধরন বিশ্লেষণ করে বলা যায়, মগবাজারের ঘটনা মূলত চার কারণে হতে পারে। এক. এলপি সিলিন্ডারের লিকেজ হওয়া গ্যাসের সঙ্গে ম্যানহোল বা ড্রেন থেকে নির্গত মিথেন গ্যাসের সংস্পর্শ। স্পিøট এসি ফ্রিজারের কমপ্রেশার বা জেনারেটরের বিস্ফোরণ অথবা এলপি সিলিন্ডার থেকে নির্গত গ্যাস। কিংবা বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণ অথবা বন্ধ স্থানে বায়োগ্যাস জমে।
তিতাসের কমিটি মনে করছে, শর্মা হাউসে বিস্ফোরণে নানামুখী কারণ ছিল। যার মধ্যে শর্মা হাউসে ব্যবহৃত এলপিজি গ্যাস বাতাস থেকে ভারী হওয়ায় সরবরাহ টিউবে লিকেজ হতে সেটি ফেøারে জমা হয়ে এ ধরনের বিস্ফোরণ হতে পারে। শর্মা হাউসের নিচতলায় দুটি এলপিজির বিস্ফোরিত সিলিন্ডারের সম্ভাব্য উপাদান ছিল বলে তদন্ত কমিটি দেখেছে। এ ছাড়া কমিটি ঘটনাস্থল পরির্দশনকালে অনেকগুলো বিধ্বস্ত স্পিøট এসিও দেখতে পায়। তাই ফ্রিজের কম্প্রেসর বিস্ফোরণেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে। কারণ ভবনের দ্বিতীয় তলায় ফ্রিজের দোকান ছিল। আবার ভবনের নিচে জেনারেটর ছিল। কোনো কারণে সেই জেনারেটর বিস্ফোরণেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে। এ ছাড়া ভবনের সামনে সিটি করপোরেশন ও ওয়াসার কাজ চলছিল। ফলে খোলা ড্রেনে পানি জমে সেখান থেকে নির্গত বায়োগ্যাস বা মিথেন গ্যাস জমে থাকতে পারে। তবে বায়োগ্যাস বা মিথেন গ্যাসের থেকে এ ধরনের ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা কম।
তদন্ত প্রতিবেদনে কমিটি পর্যালোচনা বা সুপারিশে বলেছে- তারা তিতাস গ্যাসের রাইজার পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়েছে, মগবাজারের বিস্ফোরণে তাদের পাইপলাইনের গ্যাস থেকে সংগঠিত হয়নি। এ ছাড়া যেখানে ঘটনা ঘটেছে সেই শর্মা হাউসে তিতাসের কোনো গ্যাস সংযোগ ছিল না। সেখানে রান্নায় এলপিজি সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করা হতো।
এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাব্য কারণগুলো পর্যালোচনার একাংশে কমিটি বলেছে- এলপিজি সিলিন্ডার ১৫০ পিএসআই চাপে মজুদ করা হয়। কোনো কারণে সিলিন্ডারে বিস্ফোরণ ঘটলে এলপিজির গুণাবলি অনুযায়ী ২৫০ গুণ চাপ বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে ৩৭ হাজার ৫০২০ অর্থাৎ ১৫০ গুণ ২৫০ পিএসআই চাপে বিস্ফোরণ হতে পারে, যা মারাত্মক ধ্বংসাত্মক রূপ নেয়।
এ বিষয়ে তিতাসে ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী আলী ইকবাল মোহাম্মদ নুরুল্লাহ আমাদের সময়কে বলেন, তদন্ত কমিটির রিপোর্ট থেকে বলা যায়- মগবাজারের বিস্ফোরণ মূলত এলপিজির সিলিন্ডারের গ্যাস এবং রাস্তার পাশের খোলা ড্রেন থেকে নির্গত মিথেনের সংস্পর্শে হয়েছে। এ ছাড়া ভবনটিতে এসি, ফ্রিজের দোকান ও জেনারেটর ছিল। অর্থাৎ বিস্ফোরণ হওয়ার মতো নানা উপকরণ ছিল সেখানে। সম্ভবত একটি বিস্ফোরণ নানা কিছুর সংস্পর্শে এসে বিরাট রূপ নিয়েছে। তবে এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায় যে, সেখানে তিতাস গ্যাসের কোনো সংযোগ ছিল না। যে একটি গ্যাস রাইজার ছিল, সেটি অকার্যকর।