

বেলা সাড়ে ১১টা। রাজধানীর দনিয়া কলেজের সামনের সড়ক। লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য মানুষ, কিছুটা বিশৃঙ্খল। এমন সময় এলো টিসিবির ডিলার ট্রাক। লাইনে শৃঙ্খলা এনে দাঁড়ালেন অপেক্ষারত মানুষজন। ঝটপট শুরু হয়ে গেল পণ্য বিক্রি। কিছুক্ষণ পরই শুরু হলো আকাশের গর্জন। এর পরই শুরু হলো গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি। ট্রাকের যারা পণ্য বিক্রি করছিলেন, তারা বিক্রি রেখে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন বড় একটা পলিথিন দিয়ে ট্রাকটি ঢেকে দিতে। সারিবদ্ধ ক্রেতাদের মধ্যে কেউ একজন আকুতি জানালেন- ‘ও ভাই, বৃষ্টি পড়লেও বিক্রি বন্ধ কইরেন না। অনেকক্ষণ ধইরা কষ্ট কইরা লাইনে দাঁড়াইয়া আছি।’ তার কথাতে সায় দিয়ে উঠলেন আরও অনেকে।
সারিতে অপেক্ষারতদের একজন শনিরআখড়ার বাসিন্দা মো. আবুল রহমান। তিনি বলেন, অনেকক্ষণ ধরে লাইনে জায়গা ধরে রেখেছি। কারণ লাইনে পিছিয়ে পড়লে তেল পাওয়া যাবে না। দুই ঘণ্টার মধ্যে বিক্রি শেষ হয়ে যায় টিসিবির। তাই বৃষ্টিতে ভিজে হলেও কিনতে হবে। বিক্রি বন্ধ হয়ে গেলে তেল পাব কিনা জানি না।
লাইনে দাঁড়ানো আরেক ক্রেতা মো. এনামুল হক বলেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে আছি কম দামে তেল পাব বলে। এখন বৃষ্টিতে বিক্রি বন্ধ হয়ে গেলে কষ্টটাই বৃথা যাবে। গতকাল লাইনে দাঁড়িয়েও তেল পাইনি। খালি হাতে বাড়ি ফিরে যেতে হয়েছে। আজ তেল কিনতেই হবে। নইলে রান্না হবে না।
আবুল রহমান ও এনামুলের মতো মধ্যবিত্ত শ্রেণির অনেকেই এখন নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমূল্যের কারণে টিসিবির নিত্যপণ্য বিক্রির ট্রাকের সামনে ক্রেতাদের লাইনে দাঁড়াচ্ছেন কম দামে তেল, ডাল ও চিনি কেনার জন্য। করোনাকালীন ক্রান্তিতে অনেকেরই জীবিকা-বিপর্যস্ত। একদিকে মানুষের আয় কমেছে, অন্যদিকে জীবিকা হারিয়ে বেকার হয়ে গেছেন অনেকে। তার ওপর ভোগাচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্রের বাজারদর। এমন পরিস্থিতিতে একটু কম দামে তেল, ডাল ও চিনি পেতে সবাই ছুটছেন ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ট্রাকসেল পয়েন্টগুলোতে। অতীতে টিসিবির ট্রাকের সামনে দরিদ্র শ্রেণির ভিড় দেখা গেলেও মহামারীর এ সময়ে মধ্যবিত্তরাও দাঁড়াচ্ছেন এ লাইনে। প্রতিদিন এ সংখ্যা বাড়ছে।
বয়সে তরুণ এনামুল হক আরও বলেন, পান্থপথের একটি রেস্টুরেন্টে ভালো বেতনে চাকরি করতাম। দুই মাস হয় বেতন বন্ধ। দেনা করে ছয়জনের সংসার চালাতে হচ্ছে। আগে কখনো টিসিবির ট্রাকের সামনে লাইনে দাঁড়াইনি। কিন্তু এখন দাঁড়াতে হচ্ছে। এতে কিছু টাকা সাশ্রয় হয়।
ছাতা হাতে লাইনে দাঁড়ানো আফরোজা আক্তার বলেন, বৃষ্টি হতে পারে ধারণা করে বাসা থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে বের হয়েছি। বৃষ্টি হলেও তেল কিনতে হবে। তেল ছাড়া চুলো জ্বালিয়ে লাভ নেই। কিন্তু বাজারে তেলের অনেক দাম।
এখানকার ট্রাকের সহকারী বিক্রেতা ফোরকান হোসেন বলেন, গাড়ি নিয়ে পৌঁছানোর আগেই মানুষ অপেক্ষায় বসে থাকছে। দিন দিন ক্রেতার ভিড় বাড়ছে। বিক্রি শুরুর আড়াই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যেই পণ্য শেষ হয়ে যাচ্ছে। মূলত তেলের চাহিদা সর্বাধিক। শুধু চিনি থেকে যাচ্ছে।
এখানকার ডিলার ওএসএন এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার নিতিশ চন্দ্র জানান, ক্রেতার চাহিদা বাড়লেও ঈদের পর আমাদের বরাদ্দ কমেছে। তিনি বলেন, ঈদের আগে ২১শ কেজি পণ্য বরাদ্দ পাওয়া গেলেও এখন পণ্য পাচ্ছি ১৫শ কেজি। বৃষ্টির মধ্যেও দাঁড়িয়ে পণ্য চাইছেন ক্রেতারা। এভাবে অপেক্ষার পর তাদের খালি হাতে ফেরাতে আমাদেরও কষ্ট হয়।
একই চিত্র দেখা গেছে মগবাজার মোড়ে টিসিবির ট্রাকের সামনে। মেঘলা আকাশ দেখেও বাজারের ব্যাগ হাতে লাইনে ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন প্রবীণ মো. আজম আলী। কথা হলে তিনি বলেন, ছেলে আগে একটা দোকানে কাজ করত। এখন কাজ করে ক্যুরিয়ার সার্ভিসে। পরিবারের আয় কমে গেছে। আমিও বেকার বাসায় বসে না থেকে এখানে লাইনে দাঁড়াইছি। আগে না দাঁড়াইলে সদাইপাতি পামু না।
লাইনে দাঁড়ানো আরেক ক্রেতা মোছাম্মত রিজিয়া বলেন, আমরা গরিবরাই পাই না। এখন সাহেবরা লাইনে দাঁড়াইতাছে। তিন ঘণ্টাও লাগে না বিক্রি শ্যাষ হইয়া যায়। সাহেবরাও যদি ভাগ বসায় তাইলে আমাগোর মতো গরিবরা কই যাবে।
এখানকার ডিলার ও কোয়ালিটি জেনারেল স্টোরের কর্ণধার মো. দেলোয়ার বলেন, ঈদের আগের ২১শ কেজি বরাদ্দ পেতাম। ঈদের পর প্রথম দিন ১৭শ কেজি পেয়েছি। এখন আরও কম পাচ্ছি। আজ (বুধবার) পেয়েছি ১৫শ কেজি। অথচ ক্রেতা বাড়ছে। সুতরাং খালি হাতে ফেরাতে হচ্ছে অনেককে। টিসিবি বলছে- লকডাউনের কারণে লোকবল কম থাকায় পণ্য কম ছাড়া হচ্ছে। অন্যদিকে লকডাউনের কারণে ট্রাকের সংখ্যাও কমেছে।
টিসিবির যুগ্ম পরিচালক ও মুখপাত্র হুমায়ুন কবির আমাদের সময়কে বলেন, লকডাউনের কারণে পণ্য আমদানিসহ সরবরাহ বিঘিœত হচ্ছে। মজুদ অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। আগের বরাদ্দে ১২ দিন পণ্য বিক্রি হয়েছে। বাকি সময় এই বরাদ্দে পণ্য বিক্রি হবে। তবে সামনে বরাদ্দ বাড়বে।
বর্তমানে ট্রাকের সংখ্যাও কম উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ঈদের পর লকডাউনের জন্য অনেক ডিলার আসতে পারেনি। অনেক ডিলারের কর্মীরাও আসতে পারেননি। তাই ট্রাকের সংখ্যা এখন কম। তবে পর্যায়ক্রমে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে বলে আশা করছি।
করোনা সংক্রমণের সময় ভোক্তাদের কম দামে পণ্য সরবরাহ করতে সারাদেশে গত ৫ জুলাই থেকে এ টিসিবির ট্রাকসেল শুরু হয়। ঈদের ছুটিতে এক সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর গত ২৬ জুলাই থেকে আবারও পণ্য বিক্রি চালু করে টিসিবি। সাধারণ ছুটি বাদে ২৯ জুলাই পর্যন্ত চলার কথা ছিল। তবে এই সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে।
ট্রাকসেলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর মধ্যে রয়েছে সয়াবিন, মসুর ডাল এবং চিনি। সয়াবিন প্রতি লিটার ১০০ টাকা, মসুর ডাল প্রতি কেজি ৫৫ টাকা এবং চিনি প্রতি কেজি ৫৫ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে। একজন ব্যক্তি দৈনিক ২-৪ কেজি চিনি, ২ কেজি ডাল ও ২-৫ লিটার ভোজ্যতেল কিনতে পারবেন।
হুমায়ুন কবির বলেন, চলতি মাসের ২৯ তারিখ (আজ) থেকে ট্রাক সেল পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার কথা। কিন্তু করোনাকালীন পরিস্থিতি বিবেচনায় এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর শোকাবহ আগস্ট মাস উপলক্ষে আগামী ২৬ আগস্ট পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিন বাদে বিক্রয় কার্যক্রম চলবে, জানান তিনি।