

গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন এক রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরান। গত ২৮ ডিসেম্বর মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন রূপ নিয়েছে সরকারবিরোধী এক গণবিস্ফোরণে। দেশজুড়ে এখন বিক্ষোভের আগুন জ্বলছে। রাজধানী তেহরান থেকে শুরু করে মাশহাদ, ইসফাহানসহ অন্তত ১০০টি শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। রাজপথগুলো এখন বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর লড়াইয়ে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
গত কয়েক দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা দুই শতাধিক ছাড়িয়ে গেছে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও হাসপাতাল সূত্রে খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিক্ষোভ দমনে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর অবস্থান নিলেও পিছু হটছে না বিক্ষোভকারীরা। বিশেষ করে গত শনিবার রাতে বিক্ষোভের তীব্রতা নতুন মাত্রা পেয়েছে, যেখানে খোদ রাজধানী তেহরানের সড়কগুলো আন্দোলনকারীদের দখলে চলে যায়। অনেক জায়গায় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ব্যাপক সংঘাতের খবর পাওয়া গেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইরানের সরকার ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটসহ নানা পদক্ষেপ নিলেও তাতে খুব একটা কাজ হচ্ছে না। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেল বিক্ষোভকারীদের ‘আল্লাহর শত্রু’ হিসেবে অভিহিত করে মৃত্যুদণ্ডের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জনগণের ‘স্বাধীনতার’ পক্ষে সংহতি জানিয়ে দেশটিতে সামরিক হস্তক্ষেপের প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়েছেন, যার জবাবে তেহরানও ইসরায়েল ও মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। সব মিলিয়ে ইরানের অভ্যন্তরে এক চরম অস্থিতিশীলতা ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হুমকিতে মধ্যপ্রাচ্যে ফের বড় ধরনের যুদ্ধের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এদিকে, ইরানে চলমান এই বিক্ষোভ দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। গতকাল পশ্চিম লন্ডনে ইরানের দূতাবাস প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ হয়েছে। এদিন কয়েকশ বিক্ষোভকারী দূতাবাস ভবনের বাইরে জড়ো হন। তাদের হাতে ছিল ইরানের পতাকা। তারা সরকারবিরোধী স্লোগান দেন। এ সময় একজন দূতাবাস ভবনের বারান্দায় উঠে ইরানের পতাকা নামিয়ে ফেলেন।
বিক্ষোভ ছড়িয়েছে একশ শহরে: ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বড় শহরগুলোতে বিক্ষোভের তীব্রতা বেড়েই চলেছে। গত কয়েকদিনের ধারাবাহিকতায় ইরানের সবগুলো প্রদেশের অন্তত একশ শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে বিবিসি। সংবাদ মাধ্যমটির তথ্যমতে, গত দুদিনে দুটি হাসপাতালেই শতাধিক মৃতদেহ আনা হয়েছে। তেহরানের অন্তত ছয়টি হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শুধু রাজধানীতেই অন্তত ২১৭ জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশের শরীরে গুলির ক্ষত রয়েছে। হাসপাতালগুলোতে আহত ও নিহতের ভিড়ে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে।
মাশহাদ শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর তীব্র সংঘর্ষের ভিডিও ফুটেজ যাচাই করেছে বিবিসি। সেখানে দেখা গেছে, বিক্ষোভকারীরা আগুন জ্বালিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে এবং নিরাপত্তা বাহিনী দূর থেকে তাদের ওপর গুলিবর্ষণ করছে। তেহরানের গিশা জেলা এবং পুনাক স্কয়ারে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে স্লোগান দিচ্ছে। অনেক এলাকায় বিক্ষোভকারীরা থালা-বাসন বাজিয়ে সরকারের প্রতি তাদের অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীরা এখন সরাসরি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পদত্যাগ এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রের অবসানের ডাক দিচ্ছে।
বিক্ষোভকারীরা ‘আল্লাহর শত্রু’, তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার হুঁশিয়ারি: বিক্ষোভকারীদের দমাতে আইনি ও সামরিক উভয় পথই বেছে নিয়েছে তেহরান। ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মোভাহেদি আজাদ কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যারা বিক্ষোভে অংশ নেবে তাদের ‘মোহারেবে’ বা ‘আল্লাহর শত্রু’ হিসেবে গণ্য করা হবে। ইরানি আইনে এই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।
তবে সরকারের এমন সতর্কতা ও হুঁশিয়ারিও দমাতে পারছে না বিক্ষোভকারীদের। শনিবার রাতেও ইরানজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। ইরানের পুলিশ প্রধান আহমদ-রেজা রাদান জানিয়েছেন, বিক্ষোভের ‘মূল হোতাদের’ অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ধরপাকড় অভিযান আরও জোরদার করা হবে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এ পর্যন্ত প্রায় আড়াই হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে।
বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে নামছে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী: ইরানজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠে নামছে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। এই বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি চরম সীমায় পৌঁছে গেছে।
আইআরজিসি ইরানের সেনাবাহিনী থেকে আলাদা একটি বিশেষ বাহিনী। শনিবার আইআরজিসির পক্ষ থেকে বলা হয়, তারা দেশের নিরাপত্তা ও ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের অর্জনগুলো রক্ষা করবে। এই বাহিনীর অভিযোগ, দুই রাত ধরে ‘সন্ত্রাসীরা’ সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা সংস্থার ঘাঁটিতে হামলা চালাচ্ছে, সাধারণ নাগরিক ও নিরাপত্তা কর্মীদের হত্যা করছে এবং সম্পত্তি জ্বালিয়ে দিচ্ছে।
এদিকে ইরানের সামরিক বাহিনীও বলেছে, তারা জাতীয় স্বার্থ, দেশের কৌশলগত অবকাঠামো ও জনসম্পত্তি রক্ষা করবে এবং সুরক্ষা দেবে। আইআরজিসির মতো ইরানের সেনাবাহিনীও দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অধীনে পরিচালিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পাল্টাপাল্টি হুমকি: ইরানের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘ইরান স্বাধীনতার সন্ধান করছে, যা আগে কখনো দেখেনি। যুক্তরাষ্ট্র সহায়তার জন্য প্রস্তুত!’ একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি মানুষ হত্যা বন্ধ না করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র এমনভাবে আঘাত করবে, যা তেহরান কল্পনাও করতে পারবে না।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর মতে, ট্রাম্পকে এরই মধ্যে ইরানে সামরিক হামলার বিভিন্ন বিকল্প বা ‘অপশন’ নিয়ে ব্রিফ করা হয়েছে। হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে বেসামরিক অনেক স্থাপনাও রয়েছে।
এদিকে, ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে হামলা করার কোনো ভুল পদক্ষেপ নেয়, তবে এই অঞ্চলে অবস্থিত ইসরায়েলসহ সব মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও নৌযান আমাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এমন পাল্টাপাল্টি হুমকিতে মধ্যপ্রাচ্যে ফের বড় ধরনের যুদ্ধের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর আগে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি শুক্রবার এক ভাষণে বলেন, ‘কয়েক লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ক্ষমতায় এসেছে’ এবং বিক্ষোভের মুখে তারা ‘পিছু হটবেন না।’ তার অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের মদদে ইরানে বিক্ষোভ ছড়ানো হচ্ছে। বিক্ষোভকারীরা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ‘খুশি করার চেষ্টা করছে’ বলেও মন্তব্য করেছেন খামেনি।
সর্বোচ্চ সতর্কতায় ইসরায়েল: ইরানে সাম্প্রতিক বছরগুলোর সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলার প্রেক্ষাপটে দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য যে কোনো হস্তক্ষেপ নিয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে ইসরায়েল। বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি ইসরায়েলি সূত্র এমন তথ্য জানিয়েছে। তবে ‘সর্বোচ্চ সতর্কতা’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে, সে বিষয়ে সূত্রগুলো বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
গত কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার ইরানে হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন এবং বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ না করতে ইরানের শাসকদের সতর্ক করেছেন। শনিবার ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘সহায়তার জন্য প্রস্তুত’ রয়েছে।
এর আগে গত জুনে এ ধরনের সতর্ক অবস্থান জানানোর পর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল ইসরায়েল ও ইরান। ১২ দিনব্যাপী চলা ওই যুদ্ধে উভয়পক্ষ হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়। ইসরায়েলের সঙ্গে ওই হামলায় যুক্তরাষ্ট্রও অংশ নেয় এবং দেশটির পরমাণুকেন্দ্রে বিমান হামলা চালায়।
শনিবার এক ফোনালাপে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করেন বলে জানিয়েছে আলাপ চলাকালে উপস্থিত এক ইসরায়েলি সূত্র। যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা ফোনালাপের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও আলোচনার বিষয়বস্তু জানাননি।
ইরানে বিক্ষোভ চললেও দেশটিতে সরাসরি হস্তক্ষেপের কোনো ইঙ্গিত দেয়নি ইসরায়েল। তবে ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগের কারণে দুই চিরবৈরী দেশের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। শুক্রবার প্রকাশিত দ্য ইকোনমিস্টে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেন, ইরান যদি ইসরায়েলে হামলা চালায়, তাহলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। বিক্ষোভের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘সব বিষয়ে আমি মনে করি, ইরানের ভেতরে কী ঘটছে, তা আমাদের দেখা উচিত।’