

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশালের ছয়টি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের দাখিল করা হলফনামা বিশ্লেষণে উঠে এসেছে নানা বৈচিত্র্য ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। শিক্ষাগত যোগ্যতায় যেখানে ব্যারিস্টার এট ‘ল’, এমবিবিএস চিকিৎসক, এলএলএম ও মাস্টার্স ডিগ্রিধারী প্রার্থীদের উপস্থিতি রয়েছে, পাশাপাশি ভোটের মাঠে রয়েছেন স্বশিক্ষিত, কৃষক এবং ব্যবসায়ীরাও। এই বৈচিত্র্যের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে নিজের ঝুলিতে থাকা মামলার সংখ্যা ও পেশাগত অবস্থানের বাস্তব চিত্র।
হলফনামা অনুযায়ী, বরিশালের ছয়টি সংসদীয় আসনে মোট ৪১ জন প্রার্থীর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৩২ জন প্রার্থী স্নাতক ও তদূর্ধ্ব ডিগ্রিধারী, ৬ জন স্বশিক্ষিত এবং তিনজন এসএসসি ও এইচএসসি পাস। শিক্ষাগত দিক থেকে উচ্চশিক্ষিত প্রার্থীর সংখ্যা বেশি হলেও ঝুলিতে থাকা মামলার চিত্রে রয়েছে ভিন্ন বাস্তবতা।
হলফনামার মামলার তথ্যে দেখা যায়, ছয়টি আসনের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে মোট ১৯৫টি মামলার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৭ জন প্রার্থী সম্পূর্ণ মামলাহীন বলে হলফনামায় উল্লেখ করেন। অন্যদিকে একাধিক প্রার্থীর বিরুদ্ধে রয়েছে ১০টির বেশি মামলা। সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে একজন প্রার্থীর বিরুদ্ধে থাকা ৮২টি মামলা, যা বরিশালের নির্বাচনী রাজনীতিতে নজির স্থাপন করেছে। হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যায়, বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া) আসনের পাঁচ প্রার্থীর মধ্যে তিনজনের নামে রয়েছে ১১টি মামলা, বরিশাল-২ (বানারীপাড়া-উজিরপুর) আসনের ১০ প্রার্থীর মধ্যে সাতজনের বিরুদ্ধে ১৮টি মামলা, বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসনের ৯ প্রার্থীর মধ্যে তিনজনের নামে ৪১টি মামলা, বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ) আসনের পাঁচ প্রার্থীর মধ্যে তিনজনের বিরুদ্ধে সর্বাধিক ৮৬টি মামলা, বরিশাল-৫ (সদর) আসনের ১০ প্রার্থীর মধ্যে তিনজনের নামে ১৮টি মামলা এবং বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনের পাঁচ প্রার্থীর মধ্যে দুজনের নামে রয়েছে ১২টি মামলা রয়েছে।
আসনভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ) আসনে মামলার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এখানে ৮২টি মামলার আসামি বিএনপি মনোনীত প্রার্থী কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান, বরিশাল-৩ ও বরিশাল-২ আসনেও মামলার সংখ্যাও লক্ষণীয়। এ ছাড়া বরিশাল-৩ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীনের ঝুলিতে সর্বোচ্চ ২৫টি মামলা রয়েছে। অন্যদিকে বরিশাল-৬ আসনে অধিকাংশ প্রার্থী মামলাহীন বা স্বল্প মামলার তথ্য দিয়েছেন, যা তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন চিত্র বলে অনেকে মনে করেন।
পেশাভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ব্যবসায়ী প্রার্থীদের মধ্যেই মামলার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। অপরদিকে শিক্ষক, চিকিৎসক ও কিছু আইনজীবী প্রার্থী মামলা না থাকার তথ্য দিয়েছেন। তবে আইনজীবী হয়েও কোনো কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিপুলসংখ্যক মামলা থাকায় বিষয়টি ভোটারদের মধ্যে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হলফনামায় প্রকাশিত এসব তথ্য ভোটারদের সামনে প্রার্থীদের বাস্তব অবস্থান স্পষ্ট করে তুলছে। শিক্ষা, পেশা ও মামলার তথ্য এবার ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে বরিশালের নির্বাচনী মাঠে এবার স্পষ্টভাবে মুখোমুখি দুটি চিত্রÑ একদিকে উচ্চশিক্ষিত ও মামলাহীন প্রার্থী, অন্যদিকে মামলার ভারে জর্জরিত প্রতিদ্বন্দ্বীরা।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বরিশাল মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল আলম বলেন, বাংলাদেশের বিগত দিনের প্রেক্ষাপটে ভোটারগণ এখনও প্রার্থীর যোগ্যতা বা তার নামে দায়েরকৃত ফৌজধারী মামলার বিষয়গুলো বিবেচনায় আনছেন না। যা দেশের সুশাসনের জন্য বড়ই সংকট। তবে আগামী নির্বাচনে ভোটারদের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন। রফিকুল আলম আরও বলেন, প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের উচিত তার দলের মনোনীত প্রার্থী যাতে যোগ্যতা সম্পন্নের পাশাপাশি তারা যেন ফৌজধারী অপরাধ মুক্ত থাকেন।
বরিশাল-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদিন বলেন, আমরা আইনের পথেই মামলা মোকাবিলা করে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। মামলা থাকা সত্ত্বেও আমরা ভোট পাওয়ার ন্যায্য ও সাংবিধানিক অধিকার অর্জন করেছি।