

হাসপাতাল পরিচালনার বৈধ নিবন্ধন নেই; থাকলেও মেয়াদোত্তীর্ণ। আইসিইউ থাকলেও নেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। নিবন্ধিত চিকিৎসক, নার্স কিংবা টেকনোলজিস্টও নেই। রোগীকে অযথা আইসিইউয়ে রাখা, সরকার নির্ধারিত ফি’র চেয়ে বেশি টাকা আদায়সহ নিয়মবহির্ভূত নানা কাজ চালিয়ে যাচ্ছে রাজধানীর অনেক বেসরকারি হাসপাতাল। মানহীন এমন অনেক হাসপাতাল এর আগে একাধিকবার বন্ধও করে দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কিন্তু স্থায়ীভাবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই তদবিরের চাপে বেশির ভাগ হাসপাতালই আবার খুলে যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার বিভিন্ন পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা আমাদের সময়কে জানান, রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায় থেকে এসব অনিয়মকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিতে সুপারিশ করা হয়। এমনকি কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য বিভিন্ন পর্যায় থেকে এত বেশি তদবির আসে যে, ঠিকভাবে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তারা বলেন, করোনা মহামারীর সময় বেশকিছু বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগের প্রমাণও ছিল। কিন্তু তদবিরের চাপে সেগুলো খুলে দিতে অধিদপ্তর অনেকটা বাধ্য হয়েছে।
কারা তদবির করে-এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচ্চপদস্থ কয়েক কর্মকর্তা জানান, এই তালিকায় রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য ও সচিবালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা রয়েছেন।
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. ফরিদ হোসেন মিঞা তদবিরের বিষয়ে আমাদের সময়কে বলেন, ‘অনিয়মনের কারণে হাসপাতালগুলোর কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছিল। পরিদর্শনে যেসব সমস্যা চিহ্নিত হয়, সেগুলো ঠিক করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। অধিদপ্তরের নিয়মানুযায়ী তারা সবকিছু ঠিক করে পুনরায় আবেদন করে। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আবার কার্যক্রম চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়।’
গত ১০ আগস্ট অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. ফরিদ হোসেন মিঞা অনিয়মের অভিযোগে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের যমুনা জেনারেল হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ করে দেন। একই দিন বন্ধ করে দেওয়া হয় একই এলাকার ‘ঢাকা হেলথ কেয়ার হাসপাতাল’। এ ছাড়া ওই দিন সেখানকার রয়্যাল মাল্টি স্পেশালটি হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, লাইফ কেয়ার জেনারেল হসপিটাল, রাজধানী ব্লাড ব্যাংক অ্যান্ড ট্রান্সফিউশন সেন্টার, প্রাইম অর্থোপেডিক জেনারেল হসপিটাল ও রিমেডি কেয়ার লিমিটেডে অভিযান চালিয়ে নানা অনিয়ম ধরা পড়ে।
এর আগে গত ৩১ জুলাই অনিয়মের অভিযোগে উত্তরার ১২নং সেক্টরের র্যাডিকাল হসপিটাল লিমিটেডের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একই দিন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা সেখানকার আল-আশরাফ জেনারেল হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। সেখানে দেখা যায়, একটি ভেন্টিলেটর ও একটি হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা দিয়েই ৯ শয্যার কোভিড ইউনিট পরিচালিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী ছাড়াই চলছে আইসিইউ। কোভিড ও নন-কোভিড রোগীদের চিকিৎসা চলছে একসঙ্গে। কোভিড রোগীদের ক্ষেত্রে নেওয়া হয় অক্সিজেনের অতিরিক্ত বিল।
উত্তরার শিন শিন জাপান হসপিটাল অনুমতি ছাড়াই কোভিড রোগীদের চিকিৎসা শুরু করে। সরকারি নির্দেশ উপেক্ষা করে তারা এ সংক্রান্ত সব তথ্য গোপন রাখত। এ ছাড়া নানা অজুহাতে রোগীদের কাছ থেকে ইচ্ছমতো অর্থ আদায় করত তারা।
অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, এদের মধ্যে র্যাডিকাল হসপিটালের কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। শিন শিন জাপান হাসপাতালের কোভিড চিকিৎসা বন্ধ করা হয়েছে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায় থেকে তদবির আসায় বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দিতে হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান আমাদের সময়কে বলেন, ‘যেসব প্রতিষ্ঠান অনিয়ম করছে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যেন এটি করতে পারেন, সে জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করতে হবে; সমর্থন দিতে হবে। এর পরও তদবির বা সুপারিশ উপেক্ষা করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়কে পূর্ণ সমর্থন দিতে হবে। কোনোভাবেই অন্যায় মেনে নেওয়া যাবে না।’