

রাজধানী ঢাকার মগবাজার থেকে একটি রাজনৈতিক দলের মিছিল যাচ্ছে বাংলামোটরের দিকে। রিকশাচালককে বললাম রাস্তার পাশে অপেক্ষা করতে। মিছিল থেকে ভেসে আসছে স্লোগান- ‘পিআর ছাড়া নির্বাচন/মানি না, মানব না’। রিকশাচালক গামছা দিয়ে মুখের ঘামটুকু মুছে নিয়ে বললেন, ‘ওরা আসলে নির্বাচন চায় না। নির্বাচন চাইলে এমন কথা কইতো না।’ রিকশাচালকের কথা শুনে হাসি পেল। তিনি রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ নন। প্রচলিত শিক্ষায় মাধ্যমিক পেরিয়েছেন কিনা সন্দেহ জাগতে পারে; কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর ধারণাকে উপেক্ষা করতে পারছি না। বাংলাদেশের রাজনীতি ও নির্বাচনের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন চরম উত্তেজনা। প্রতিনিয়ত সংবাদমাধ্যমে লেখা হচ্ছে নির্বাচন ঘিরে নানা শঙ্কার কথা। টেলিভিশনের টকশোজীবীদের আশঙ্কা আরও এক কাঠি বেশি। সেই সঙ্গে সাম্প্রতিক বছরে আলোচনায় আসা ইউটিউবে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে একপাক্ষিক বক্তব্য তুলে ধরা বিশেষজ্ঞরাতো আছেনই। এমন সময়ে রিকশাচালকের এই বিশেষজ্ঞ মতামতকে উপেক্ষা করার জন্য মন থেকেও সায় পাই না। মিছিল চলে গেলে রিকশা আবার চলতে শুরু করে। এই রাজনীতি-বিশ্লেষকের আরও মতামত জানার জন্য পাল্টা প্রশ্ন করিÑ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের জোট বিষয়ে কোনো খবর আছে কিনা? এবার রিকশাচালক যা বললেন, তার সার কথা হচ্ছেÑ যারা নির্বাচন চায় তারা এখন আন্দোলনের হুমকি দেবে কেন! যারা নির্বাচন বানচাল করতে চায় অথবা অন্য উদ্দেশ্য আছে তারাই আন্দোলনের কথা বলছে; কিন্তু দিনশেষে জনগণই জিতবে।
দিনশেষে জনগণই জিতবেÑ কথাটি শুনে জানতে চাই, জনগণ কী চায়? রিকশার প্যাডেল ঠেলতে ঠেলেতে একবার ঘার ঘুড়িয়ে পেছেনে তাকিয়ে অল্প কথায় বললেনÑ ‘জনগণ চায় ভোট দিবার। আর চায় দুই বেলা পেটভরি ভাত খাবার।’
২
বাংলাদেশের রাজনীত নিয়ে একটি বহু প্রচলিত বুলি হচ্ছে- ভাতের আগে ভোটের অধিকার। বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির শুরুতেই ছিল ভোটের অধিকার। এখনও দেখা যাচ্ছে সেই ধারা অব্যাহত আছে। জনসাধারণের কাছে ভোটের অধিকার হচ্ছে তার আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠা নিশ্চিতের মাপকাঠি।
বাংলাদেশের গ্রাম-গঞ্জে, চায়ের দোকানে ও রাস্তাঘাটে লোকজন অনেক অপ্রয়োজনীয় কথা বলে; কিন্তু তাঁদের অনেকের দিব্যদৃষ্টি ও রাজনৈতিক সচেতনতা একজন পেশাদার রাজনৈতিক কৌশলবিদের চেয়ে কম নয়। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বোঝার জন্য রাজনৈতিক নেতা কিংবা বিশ্লেষক হওয়ার প্রয়োজন নেই। চোখ ও কান সজাগ রাখলেই যথেষ্ট।
যে কোনো দেশের সাধারণ নির্বাচন সাধারণ কোনো বিষয় নয়। পরবর্তী একটি মেয়াদে কারা দেশ পরিচালনা করবে তা নির্ধারণ করা হয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। সাধারণ নির্বাচন দেশের ভাগ্য পরিবর্তনের পথ। সেখানে ভোটার তথা জনগণের সঠিক সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে জাতির ভাগ্য, দেশের ভাগ্য; আসতে পারে ইতিবাচক পরিবর্তন অথবা ভাগ্য খারাপ হলে ঘটতে পারে বিপর্যয়। বিশে^র বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে সাধারণ নির্বাচনের আগে নির্বাচনী জোট হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় এমন সব রাজনৈতিক দল জোট গঠন করেছে, যাদের নীতি-আদর্শে কোনো মিল নেই। দেখা যায় কট্টর দক্ষিণপন্থি দলের সঙ্গে বামপন্থি দল জোট বেঁধেছে। মধ্যপন্থি কোনো দল কট্টরপন্থিকে সঙ্গী করছে। বাংলাদেশেও অতীতে বহু রাজনৈতিক জোট ও ঐক্য হয়েছে। বহু দলের ও বহু জোটের সরকার গঠিত হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের মানুষের আছে। এবার আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে এখন থেকেই যে নির্বাচনী জোটের আলোচনা শোনা যাচ্ছে, তাতে এসব জোটকে মোটা দাগে দুটি ভাগে বিভক্ত করা যায়Ñ বাংলাদেশপন্থি এবং দক্ষিণপন্থি। বাংলাদেশপন্থি দাবি যারা করছে, তারা নির্বাচন চাইছে। আর দক্ষিণপন্থি অংশ নির্বাচনকে অনিশ্চয়তার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
আগামী ফেব্রুয়ারিতে সাধারণ নির্বাচন করার ঘোষণা এসেছে। কিছুদিন যাবৎ ছোট দলগুলো জোটগঠনের জন্য বিভিন্ন জায়গায় বেশ কয়েকটি মধ্যাহ্নভোজ অথবা নৈশভোজে মিলিত হয়েছেÑ এমন খবর পাওয়া গেছে। নির্বাচন ঘিরে এসব জোটের ভূমিকা কেমন হবে এখনও তা পরিষ্কার নয়। ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনীতির পটভূমিতে নতুন দল ও জোটের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এটি অবশ্য অনিবার্য। বর্তমানে বিএনপি, জাতীয় নাগরিক পার্টি, জামায়াতে ইসলামী ও কয়েকটি বাম সংগঠন জোটগঠনের ব্যাপারে উদ্যোগী বলা যায়। আবার মানবেতিহাসের প্রথম পাতানো বিরোধী দল জাতীয় পার্টির রাজনীতির ললাটে কী বিধান লেখা হবে, সেটি এখনও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
৩
তবে পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছেÑ আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো দলের এককভাবে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। হয় জোট, না হয় আসন সমঝোতা করে ভোটে অংশ নিতে হতে পারে রাজনৈতিক দলগুলোকে। রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতা দেখে অনুমাণ করা যায়, সমমনা দল ও জোট নিয়ে বিএনপির নেতৃত্বে একটি বড় জোট হতে পারে। পাশাপাশি কয়েকটি দলের সঙ্গে আসন সমঝোতাও হতে পারে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলনসহ ইসলামি দলগুলোর পৃথক জোট বা আসন সমঝোতা হতে পারে। এছাড়া এনসিপিরও জোটগঠনের সম্ভাবনা রয়েছে উদারপন্থি বলে পরিচিত কয়েকটি দলের সঙ্গে। এছাড়া বাম ও ইসলামি দলগুলোর আলাদাভাবে আরও দুটি জোটগঠনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। অক্টোবর বা নভেম্বরের শুরুর দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে জোট কিংবা সমঝোতার বিষয়টি হয়তো জানা যাবে।
ভোটের জন্য জোটগঠন এক কথা, আর ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য জোট করা আরেক কথা। আবার দেশের সমস্যা সমাধানে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার তাগিত থেকে জোট করা ভিন্ন বিষয়। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, দেশের আর্থসামাজিক উন্নতি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে যেসব রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধ হবেÑ বাংলাদেশের এখন এমন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দরকার। স্বৈরাচার পতনের পর দেশের সন্ধিক্ষণে ভোট সামনে রেখে জোটগঠনের রাজনীতি করলে বাংলাদেশের মানুষ কাউকে ক্ষমা করবে না। রাজনৈতিক দলের সামনে এখন দুটি পথÑ জনগণের পক্ষে অবস্থান নিয়ে মানুষের হৃদয়ের আসন অথবা বিতাড়িত হয়ে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়।
এহ্সান মাহমুদ : নির্বাহী সম্পাদক, আমাদের সময়; কথাসাহিত্যিক
মতামত লেখকের নিজস্ব