

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সম্প্রতি ডিম নিক্ষেপ একটি আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রে এনসিপি নেতা আখতার হোসেনকে ডিম নিক্ষেপ ও তাসনিম জারাকে নোংরা গালাগাল করার ঘটনা শুধু একটি তাৎক্ষণিক বা বিচ্ছিন্ন বিতর্কের বিষয় নয়; বরং এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্তর্নিহিত অসুস্থতার প্রতীক। একদিকে প্রবাসী আওয়ামী লীগের এ ধরনের অপকর্মে সম্পৃক্ততা, অন্যদিকে দেশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা দুটিই আমাদের দেখিয়ে দেয় কীভাবে রাজনৈতিক শিষ্টাচার ধীরে ধীরে ভেঙে পড়েছে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে তেমনভাবে রাজনীতির সুস্থ সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। তারপরও বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার পর। সামরিক শাসন রাজনীতিকে ‘গণতন্ত্র’ থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং ধীরে ধীরে পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক রাজনীতি বা ইংরেজিতে যেটাকে বলে patron-client politics শক্তিশালী হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা তখনই মূলত শুরু হয়।
১৯৯০ সালে রক্তক্ষয়ী গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সামরিক শাসনের অবসান ঘটলেও রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠেনি। বরং ক্ষমতার পালাবদলই হয়ে দাঁড়ায় রাজনীতির প্রধান বিষয়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন দুই শিবিরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সহাবস্থান ও পরমতসহিষ্ণুতাকে ধ্বংস করেছে।
সাম্প্রতিক অভ্যুত্থান-পূর্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও একবার প্রমাণ করেছে ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব গণতান্ত্রিকচর্চার পরিবর্তে বলপ্রয়োগ, দমননীতি ও বিভাজনের রাজনীতি বেছে নেয়। নির্বাচনের আগের বছর রাজনৈতিক অঙ্গন ছিল প্রচণ্ড সহিংসতা, পাল্টাবক্তব্য ও গুজবের আখড়ায় ভরপুর।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতি তাত্ত্বিকভাবে নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করলেও বাস্তবে আগের সংস্কৃতিই টিকে আছে। ফলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করতে এখন আর যুক্তি নয়; বরং অপমান ও প্রতীকী আক্রমণই অস্ত্র হয়ে উঠছে।
ডিম নিক্ষেপ প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে অনেক দেশে ব্যবহার করা হয়েছে। ২০০১ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে ডিম ছোড়া হয় নির্বাচনী প্রচারে। ২০১০ সালে ফরাসি প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি ডিমাঘাত পান এক সমাবেশে। ২০১৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসনকে একজন তরুণী ডিম নিক্ষেপ করেন।
এসব দেশে ডিম নিক্ষেপ মূলত প্রতীকী প্রতিবাদ, গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং নেতাদের সমালোচনার নাটকীয় মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর ভিন্নতা রয়েছে। এখানে ডিম নিক্ষেপ প্রতীকী প্রতিবাদ না থেকে বরং প্রতিপক্ষকে সামাজিকভাবে হেয় করা ও ভয় দেখানোর হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্যও নেতিবাচক।
পশ্চিমা বিশে^র খ্যাতিমান রাজনৈতিক তাত্ত্বিক স্যামুয়েল হান্টিংটন তার চড়ষরঃরপধষ ঙৎফবৎ রহ ঈযধহমরহম ঝড়পরবঃরবং বইয়ে বলেছেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোয় রাজনীতি যখন ক্ষমতার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ হয়, তখন শিষ্টাচার ও প্রাতিষ্ঠানিকতা দুর্বল হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের ঘটনাবলি হান্টিংটনের এই তত্ত্বের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়।
শেখ হাসিনার দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রায় উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বাড়লেও তার নেতৃত্বে রাজনৈতিক শিষ্টাচারের ঘাটতি স্পষ্ট; বলতে গেলে কিছুই ছিল না। বিরোধী দলকে রাষ্ট্রবিরোধী আখ্যা দেওয়া, তাদের সঙ্গে সংলাপে অনীহা, এমনকি প্রবাসী অঙ্গনেও বিভাজন তৈরিÑ এসব কারণে রাজনৈতিক সহনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দলের পক্ষ থেকেও প্রতিদ্বন্দ্বিতার সংস্কৃতি ইতিবাচক হয়নি। উভয় পক্ষই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার নীতি গ্রহণ করে, যা জনগণকে আরও বিভক্ত করেছে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের রাজনীতি আজ আর কেবল নস্টালজিয়া বা সংস্কৃতি রক্ষায় সীমিত নেই। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসী অঙ্গনেও এখন দেশীয় রাজনীতির প্রতিচ্ছবি। দলীয় বিভক্তি, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা এবং ক্ষমতার হিসাব সেখানে প্রবাসীদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করেছে।
আখতারকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রে ডিম নিক্ষেপের ঘটনা প্রমাণ করেÑ প্রবাসেও রাজনৈতিক শিষ্টাচার অনুপস্থিত; বরং প্রবাসী রাজনীতি এখন দেশের রাজনীতির নেতিবাচক রূপকে রপ্তানি করছে। এটি শুধু প্রবাসী সমাজে অশান্তি বাড়াচ্ছে না; বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকেও ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে বোঝার জন্য কয়েকটি মূল বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা যায়Ñ সহিষ্ণুতার অভাবে বিরোধী মতকে গণতান্ত্রিক বাস্তবতা নয়, বরং ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখা। ডিম নিক্ষেপ বা জুতা ছোড়ার মতো কৌশলগুলো আর ব্যঙ্গ বা ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ নেই; এগুলো অপমানের হাতিয়ার। ক্ষমতাকেন্দ্রিকতা রাজনৈতিক দলগুলো রাষ্ট্রকে নিজেদের সম্পত্তি ভাবছে। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতায় সংসদ, নির্বাচন কমিশন বা রাজনৈতিক ফোরামগুলো গণতান্ত্রিক বিতর্কের প্ল্যাটফর্ম হতে ব্যর্থ হচ্ছে। মোটা দাগে এ চারটি বৈশিষ্ট্য মিলেই গড়ে উঠেছে ডিম কালচারÑ যেখানে প্রতিপক্ষকে যুক্তি বা নীতি দিয়ে নয়, অপমান দিয়ে পরাজিত করার প্রবণতা প্রবল।
এর থেকে উত্তরণ জরুরি এবং উত্তরণের জন্য অবশ্যই ভাবতে হবে। নেতাদের বক্তব্য ও আচরণে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলা দরকার। প্রতীকী প্রতিবাদ বা সামাজিক ব্যঙ্গ বা নাটকীয় প্রতিবাদকে অপমানের অস্ত্র না বানিয়ে সাধারণভাবে গ্রহণের মানসিকতা তৈরি করতে হবে। প্রবাসী রাজনীতির সংস্কারে বদল এনে প্রবাসীদের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কমিয়ে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে হবে। গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিকতা জোরদার করে সংসদ ও নির্বাচনীব্যবস্থাকে কার্যকর করা, যেন রাস্তায় বা প্রবাসে অপমানের রাজনীতি কমে আসে। যুবসমাজকে সম্পৃক্ত করার মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মকে গঠনমূলক রাজনীতিতে আকৃষ্ট করার ব্যবস্থা করতে হবে। ডিম নিক্ষেপের ঘটনা হয়তো ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বড় অসুখের লক্ষণ। স্বাধীন বংলাদেশে রাজনীতির যে অস্থিরতা শুরু, আজকের প্রবাসী রাজনীতিÑ সব জায়গায়ই অসহিষ্ণুতা, ক্ষমতার লোভ এবং শিষ্টাচারের অভাব স্পষ্ট। যদি রাজনৈতিক নেতৃত্ব সহিষ্ণু ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় আন্তরিক না হন, তবে বাংলাদেশে রাজনীতি ক্রমেই আরও বিভক্ত হবে।
‘ডিম কালচার’ তাই কেবল একটি হাস্যরসাত্মক বা নাটকীয় ঘটনা নয়; এটি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্ধকার দিকের প্রতীক। এই প্রতীক যতদিন টিকে থাকবে, ততদিন বাংলাদেশের গণতন্ত্র সুস্থ হয়ে উঠবে না।
আশরাফুল ইসলাম : ভারপ্রাপ্ত বার্তা সম্পাদক, দৈনিক আমাদের সময়
মতামত লেখকের নিজস্ব