রবিবার, ০৪ জানুয়ারী ২০২৬, ০৬:২০ অপরাহ্ন

নিউইয়র্কে ট্রাম্প কার্ডেই জ্বলে উঠলেন কুওমো

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৫
  • ১১৬ বার

নিউ ইয়র্কের রাজনীতিতে আবারো ফিরলেন একসময়ের শক্তিমান নেতা, সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুওমো। একসময় যৌন হয়রানির অভিযোগে পদত্যাগ করতে বাধ্য হওয়া এই রাজনীতিক এখন নতুন এক অভিযানে নেমেছেন—নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। চার বছর রাজনীতি থেকে দূরে থাকার পর তাঁর এই প্রত্যাবর্তন যেন নিউ ইয়র্কের রাজনীতিতে নতুন আলোড়ন তুলেছে।
রবিবার ম্যানহাটনের এক সমাবেশে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার সূচনা করেন। সমর্থকদের ভিড়, স্লোগান, ব্যানার—সব মিলিয়ে সেটি যেন ছিল এক উৎসবের মঞ্চ। গভর্নর পদে থাকা অবস্থায় যে বিতর্ক তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল, তা ভুলে নতুন করে বিশ্বাস ও আশার রাজনীতি গড়ে তুলতে চান কুওমো। সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “নিউ ইয়র্ক এখন কঠিন সময় পার করছে। আমাদের শহরকে নতুন করে জাগিয়ে তুলতে ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।”
অ্যান্ড্রু কুওমো নিউ ইয়র্কের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক প্রভাবশালী নাম। তাঁর পিতা মারিও কুওমো ছিলেন তিন মেয়াদের গভর্নর। রাজনৈতিক ঐতিহ্যের সেই ধারা টেনে তিনি নিজেও দশ বছর গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু ২০২১ সালে যৌন হয়রানির অভিযোগ এবং কোভিড-১৯ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের জন্য তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়। যদিও তিনি বরাবর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, তবু সেই সময়ে তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার যেন থমকে গিয়েছিল।
তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। ৬৭ বছর বয়সী কুওমো আবারো আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বললেন, “আমি ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছি। এবার আমি নিউ ইয়র্কের জন্য বাস্তবসম্মত সমাধান নিয়ে এসেছি।” তাঁর প্রচারণায় জোর দেওয়া হয়েছে তিনটি মূল ইস্যুতে—অর্থনৈতিক সাশ্রয়, নিরাপত্তা, এবং ঐক্য।
ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রাইমারিতে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন রাজনীতির নবাগত ও মুসলিম বংশোদ্ভূত জোহরান মামদানির সঙ্গে। মামদানি ‘ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট’ হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত মামদানি প্রাইমারিতে জয়ী হন, আর কুওমো মাত্র ৪৮ শতাংশ ভোট পেয়ে পরাজিত হন। কিন্তু ভোটের ফল ঘোষণার আগেই তিনি পরাজয় মেনে নিয়ে ঘোষণা দেন—তিনি এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ময়দানে নামবেন।
“আমার প্রতিদ্বন্দ্বী চটকদার স্লোগান দিচ্ছেন, কিন্তু বাস্তব কোনো পরিকল্পনা নেই,”—এভাবেই কটাক্ষ করেন কুওমো। তাঁর মতে, নিউ ইয়র্কবাসী এমন এক মেয়র চান, যিনি শুধু কথা নয়, কাজের অভিজ্ঞতা দিয়ে সমস্যার সমাধান করতে পারবেন। তিনি বলেন, “আমার লক্ষ্য নিউ ইয়র্ককে সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও ন্যায্য করে তোলা।”
প্রচারণার অংশ হিসেবে কুওমো সম্প্রতি এমন এক পদক্ষেপ নিয়েছেন যা নজর কেড়েছে বিশ্বমিডিয়ার—তিনি প্রথমবারের মতো নিউ ইয়র্কের একটি মসজিদে গিয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ব্রঙ্কসের ফুতা ইসলামিক সেন্টারে অনুষ্ঠিত সেই প্রচারণা সভায় তাঁর উপস্থিতি ছিল এক বিশেষ মুহূর্ত।
মসজিদের মঞ্চে উঠে কুওমো প্রথমে এক নোটকার্ডের দিকে তাকিয়ে আরবি শুভেচ্ছা জানানোর চেষ্টা করেন। কয়েকবার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর অবশেষে ধীরে বলেন, “আসসালামু আলাইকুম।” উপস্থিত মুসল্লিরা বিস্মিত হলেও তাঁর প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানান। মসজিদের পশ্চিম আফ্রিকান বংশোদ্ভূত অভিবাসীরা তাঁর বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনেন।
কুওমো বলেন, “আমার দাদা প্রায় এক শতাব্দী আগে ইতালি থেকে এসেছিলেন, যেমন আপনাদের অনেকেই নতুন স্বপ্ন নিয়ে এসেছেন। আমি চাই, নিউ ইয়র্কে প্রত্যেকে তাদের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে পারে।” তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, নির্বাচিত হলে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য বাস ও সাবওয়ে বিনা মূল্যে করা হবে, এবং ভাড়া কমাতে বিশেষ পদক্ষেপ নেবেন।
তাঁর এই সফরকে অনেকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেই দেখছেন। কারণ, তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জোহরান মামদানি নিজে মুসলিম, এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে তাঁর প্রভাব যথেষ্ট। মামদানি বহুবার এই মসজিদে গিয়েছেন, ফলে কুওমোর সফরকে অনেকেই ‘প্রতিদ্বন্দ্বীর ঘাঁটিতে প্রবেশ’ হিসেবে দেখছেন।
তবে মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া মিশ্র। ফুতা ইসলামিক সেন্টারের নেতা মামাদু দিয়ালো বলেন, “আমরা চাই প্রার্থীরা আমাদের কথা শুনুক। কুওমোর আগমন ভালো উদ্যোগ, তবে তিনি নির্বাচিত হলে যেন প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন।” অনেক মুসল্লি তাঁর গভর্নর থাকাকালীন সময়ের সিদ্ধান্তগুলোকে ইতিবাচকভাবে স্মরণ করেন—বিশেষ করে ন্যূনতম মজুরি ১৫ ডলার নির্ধারণের উদ্যোগকে।
অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মের কিছু মুসলিম ভোটার কুওমোকে সন্দেহের চোখে দেখছেন। ২৩ বছর বয়সী ওসমানে দিয়ালো বলেন, “নির্বাচনের এত কাছে এসে মসজিদে আসা নিছক ভোটের কৌশল। আমাদের নতুন চিন্তাভাবনাসম্পন্ন রাজনীতিবিদ দরকার।”
এমন সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও কুওমো তাঁর প্রচারণা থামাননি। তাঁর প্রচারদল দাবি করেছে, তিনি ১০০ জনের বেশি ধর্মীয় নেতার সমর্থন পেয়েছেন। যদিও পরে নিউ ইয়র্ক টাইমসের অনুসন্ধানে দেখা যায়, তালিকায় থাকা দুই ইমামের নাম ভুলবশত যোগ করা হয়েছিল। কুওমোর মুখপাত্র রিচ আজ্জোপার্দি বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “এটি আমাদের দলের অভ্যন্তরীণ বিভ্রান্তি।”
অ্যান্ড্রু কুওমো বরাবরই ইসরায়েলপন্থী অবস্থান নিয়েছেন। ২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধ শুরু হলে তিনি প্রকাশ্যে ইসরায়েলের পক্ষে অবস্থান নেন এবং এমনকি নেতানিয়াহুর পক্ষে আইনি পরামর্শদলেও যোগ দেন। ফলে, মুসলিম সম্প্রদায়ের একাংশের কাছে তিনি সন্দেহভাজন রয়ে গেছেন। তবে ডেমোক্রেটিক দলের পুরোনো ও প্রভাবশালী নেতারা, যেমন সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এবং সিনেটর চাক শুমার, তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল। তাঁরা প্রাইমারিতে মামদানিকে সমর্থন না দিয়ে নিরপেক্ষ ছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, কুওমো এবার “ট্রাম্প কার্ড” খেলেছেন—একদিকে ইহুদি ভোট ব্যাংক ধরে রাখা, অন্যদিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের সহানুভূতি অর্জনের প্রচেষ্টা। এটি এক জটিল কিন্তু সাহসী কৌশল।
নিউ ইয়র্কে প্রায় এক মিলিয়ন ইহুদি ও তিন লাখের বেশি মুসলিম বাস করেন। এই বৈচিত্র্যময় শহরের রাজনীতি ধর্ম, অভিবাসন ও অর্থনৈতিক ইস্যুর মিশ্রণে গঠিত। তাই কুওমোর এই সফর অনেকের কাছে প্রতীকী পদক্ষেপ—বৈচিত্র্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য স্থাপনের প্রচেষ্টা।
কুওমো বলেন, “নিউ ইয়র্ক হচ্ছে পৃথিবীর ক্ষুদ্র সংস্করণ—এখানে সব জাতি, ধর্ম, বর্ণের মানুষ বাস করে। যদি আমরা এখানে একসঙ্গে থাকতে পারি, তবে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তেই শান্তি সম্ভব।”
যদিও সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যাচ্ছে, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তিনি এখনো পিছিয়ে আছেন, তবু তাঁর পুনরুত্থানের গল্প ইতোমধ্যেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। অনেকেই বলছেন, এই নির্বাচন শুধু একজন মেয়র বাছাই নয়—এটি নিউ ইয়র্কের আত্মাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার নির্বাচন।
অ্যান্ড্রু কুওমো জানেন, তাঁর পথে কাঁটা অনেক। অভিযোগ, সমালোচনা, বিশ্বাসের সংকট—সবই তাঁর যাত্রার অংশ। তবু তিনি বলছেন, “আমি অতীতের ছায়া থেকে উঠে এসেছি। আমি বিশ্বাস করি, নিউ ইয়র্ক আবার জেগে উঠবে। আমি সেই জাগরণের নেতৃত্ব দিতে চাই।”
সময়ের সঙ্গে দেখা যাবে, তাঁর এই প্রত্যাবর্তন রাজনীতির নতুন দিগন্ত খুলবে, নাকি অতীতের ছায়াতেই হারিয়ে যাবে। তবে আপাতত একটাই কথা স্পষ্ট—অ্যান্ড্রু কুওমো আবারো নিউ ইয়র্কের রাজনীতিতে কেন্দ্রীয় আলোচনায়, আর তাঁর লক্ষ্য শুধু জয় নয়, নিজের পুনরুদ্ধারও।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com