শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬, ০২:২৬ অপরাহ্ন

মামলার বাইরে থাকবে ডাকের নিয়ন্ত্রক উইং

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৫
  • ১০৯ বার

দেশের ডাকসেবার পরিধি বাড়াতে চায় ডাক অধিদপ্তর। বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিসের মতো দ্রুতগামী সেবা দেওয়ার চিন্তা থেকে যুগোপযোগী কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ডাক আইনকে প্রযুক্তিনির্ভর ও নাগরিকবান্ধব করার চেষ্টা করছে সরকার। ডাকসেবা অধ্যাদেশ, ২০২৫ নামে একটি আইন করা হচ্ছে। শিগগির প্রস্তাবটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হবে। তবে আইনের কিছু দিক সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রতিষ্ঠানটি নিজেরা ব্যবসা করবে আর পাশাপাশি বেসরকারি অন্য প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় থাকবে। দিতে পারবে শাস্তিও। একই প্রতিষ্ঠানের দুই ধরনের কর্মকাণ্ডের সুযোগকে সাংঘর্ষিক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ হিসেবে ভূমিকায় থাকলে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ থাকবে না। ন্যায্যতা নিশ্চিত করার সম্ভাবনা থাকবে। প্রস্তাবিত আইনের এ সুযোগকে ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সবচেয়ে নেতিবাচক দিক হচ্ছে- সরকার জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন বা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্দেশনার প্রয়োজনে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের নিয়ন্ত্রক উইংকে সাধারণ বা বিশেষ নির্দেশ দিতে পারবে; তবে কোনো মামলা বা তদন্তের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত প্রদানের জন্য কোনো নির্দেশ দিতে পারবে না।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে প্রায় ১০ হাজার ডাকঘর আছে। জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন থেকে শুরু করে কিছু এলাকায় গ্রাম পর্যায়েও। রয়েছে অন্তত ৪০ হাজার জনবল। সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটির অফিস ও জনবলকে আধুনিকায়ন ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর করলে বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিসের চেয়ে প্রতিযোগিতায় অনেক এগিয়ে যাওয়ার কথা। দেশে প্রায় দুই শতাধিক কুরিয়ার সার্ভিস রয়েছে। কিন্তু হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পরিধি দেশজুড়ে। সেবার মানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ডাক বিভাগ অনেক বেশি দ্রুতগামী হওয়ার কথা। কিন্তু সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটি চলছে ঢিমেতালে। এ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে প্রথমেই দরকার সমস্ত ডাকঘর পর্যায়ে চিঠি ও পণ্য দ্রুততার সঙ্গে পৌঁছানো নিশ্চিত করা।

ডাকসেবা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর খসড়া অনুযায়ী সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হতে চায় ডাক অধিদপ্তর। কোম্পানি গঠনের ক্ষমতা রয়েছে আইনে। প্রস্তাবিত অধ্যাদেশের ৯৮ ধারায় বলা হয়েছে এ বিষয়ে। পরের ধারায় বলা হয়েছেÑ বাংলাদেশ ডাক এজেন্সি গ্রহণ ও পরিচালনা করতে পারবে। আরও বলা হয়েছেÑ সার্বজনীন সেবা তহবিল ও ভতুর্কি প্রসঙ্গে। সর্বজনীন ডাকসেবা প্রদানে যদি বাংলাদেশ ডাক বিভাগকে আর্থিকভাবে ঘাটতি বহন করতে হয়, তাহলে সরকারকে তা পূরণ করতে হবে। সরকার চাইলে ডাক ও কুরিয়ার খাতের উন্নয়ন ও সার্বজনীন সেবার ব্যয় আংশিক বহন করতে সেবা তহবিল গঠন করতে পারবে। ওই তহবিলে সরকারি অনুদান ও প্রয়োজনে লাইসেন্সধারী বেসরকারি অপারেটরদের কাছ থেকে মোট আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ সার্ভিস চার্জ/লেভি হিসেবে জমা নেওয়া হবে। এ ছাড়া ডাকের একটি নিজস্ব তহবিল থাকবে। ওই তহবিলে লাইসেন্স ফি, সার্ভিস চার্জ, প্রশাসনিক জরিমানা, সরকারের দেওয়া অনুদান এবং বৈধ অন্যান্য ফি জমা হবে।

বলা হচ্ছে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি ব্যবসার প্রতিযোগিতা এ দুটি সাংঘর্ষিক। ডাক বিভাগ কর্তৃপক্ষ থাকলে নিরপেক্ষতা বজায় রাখার ঝুঁকি থেকে যায়। তথ্যমতে, নতুন আইনে ডাকের প্রধান হবেন বিসিএস (ডাক) ক্যাডারের পদোন্নতিপ্রাপ্ত গ্রেড-১ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। অতিরিক্ত মহাপরিচালক হবেন ডাক ক্যাডারের গ্রেড-২ পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। ডেজিগনেটেড অপারেটরের ভূমিকা ভিন্ন লাইসেন্স বা অনুমোদন প্রদানকারী ডাকসেবা ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত মেইলিং অপারেটর ও কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণের জন্য অতিরিক্ত মহাপরিচালকের অধীনে একটি নিয়ন্ত্রণ উইং থাকবে।

ডাক বিভাগের কার্যাবলীর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, জাতীয় নির্ধারিত ডাক অপারেটর হিসেবে সমগ্র বাংলাদেশের সার্বজনীন ডাকসেবার জন্য ডেজিগনেটেড অপারেটর হবে। সরকার কর্তৃক অনুমোদিত হারে সর্বজনীন ডাকসেবার জন্য প্রযোজ্য মাশুল নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ ডাক। এই সেবার মূল্যহার সবার নাগালের মধ্যে রাখার জন্য সরকার প্রয়োজনবোধে ভর্তুকি দেবে ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক সাহায্য করবে। অর্থাৎ, সেবার পাশাপাশি একদিকে ব্যবসা করবে, কোম্পানি গঠন করবে, অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাওয়া চার্জ বা ফি নেবেÑ এরপরও ভতুর্কি হলে তা দেবে সরকার।

অবশ্য প্রস্তাবিত আইনের ভালো দিক আছে অনেকগুলো। যেমন- নিজস্ব উদ্যোগে পোস্টশপ করবে। এটি হচ্ছে ডাকঘরভিত্তিক দোকান। দেশি বা সরকারের অনুমোদনক্রমে বিদেশি অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে অংশীদারত্বমূলক বা বিনিময় চুক্তি করে যৌথ বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে। জনগণকে আর্থিক সেবা দিতে ডাকযোগে অর্থপ্রেরণ, ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকিং, ডাক জীবনবীমার অনেক সেবার উল্লেখ রয়েছে। তবে এ আইনের সবচেয়ে নেতিবাচক দিক হলো- নিয়ন্ত্রক কার্যাবলী। বলা হয়েছে, সরকার জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন বা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্দেশনার প্রয়োজনে বাংলাদেশ ডাকের নিয়ন্ত্রক উইংকে সাধারণ বা বিশেষ নির্দেশ দিতে পারবে। তবে সরকার বাংলাদেশ ডাকের নিয়ন্ত্রক উইংকে কোনো মামলা বা তদন্তের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত প্রদানের জন্য কোনো নির্দেশ দিতে পারবে না। বাংলাদেশ ডাকের নিয়ন্ত্রক উইং প্রতি মাসে বা সরকার যখন চাইবে তাঁর কার্যক্রম ও খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি মন্ত্রণালয়ের ও পোস্টাল কাউন্সিলের কাছে রিপোর্ট দেবেন।

বাংলাদেশ ডাকের অনুমোদন ব্যতীত কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা বাহক কর্তৃক সরকারি অনুমোদন/লাইসেন্স ছাড়া ডাক, কুরিয়ার বা পার্সেল সেবা ব্যবসার সুযোগ নেই। করলে আইন লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। ডাকের নিয়ন্ত্রক উইংয়ের কাছে আবেদন করে ৫ থেকে ১০ বছর মেয়াদি লাইসেন্স মিলবে। বাংলাদেশ ডাক নিজেরাও অপারেটর। তারা আবার নিয়ন্ত্রকও। এর ফলে জবাবদিহিতা কমতে পারে এবং অন্য সেবা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অন্যায় সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার শঙ্কা থাকে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এসব বিষয়ে ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এসএম শাহাব উদ্দীনের বক্তব্য জানার চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি।

তবে ডাক অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে ডিজিটাল রূপান্তর, আধুনিক ঠিকানা ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত মাইগ্রেশন সংক্রান্ত ঠিকানা সংরক্ষণ, ব্যক্তিগত উপাত্তের নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা বৃদ্ধি- এই পাঁচটি মূল বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আধুনিক নিয়ন্ত্রক কাঠামো : বাংলাদেশ ডাকের অধীনে একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালকের নেতৃত্বে নিয়ন্ত্রণ উইং প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বাণিজ্যিক ডাক ও কুরিয়ার অপারেটরদের লাইসেন্স প্রদান, নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা তদারকি করবে। লাইসেন্সবিহীন ব্যবসা পরিচালনায় সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করার বিধান রাখা হয়েছে।

ডিজিটাল রূপান্তর ও উপাত্ত সুরক্ষা : নতুন আইনে ডিজিটাল ডাকটিকিট চালুর পাশাপাশি একটি কেন্দ্রীয় ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে সব অপারেটরের সেবার আন্তঃপরিচালন নিশ্চিত হয়।

বাংলাদেশ ডাকের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা বৃদ্ধি : ডাকসেবাকে জরুরি সেবা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে জাতীয় সংকটকালে ডাকযান ও কর্মীদের অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা হবে। এ ছাড়া চিফ কন্ট্রোলার অব স্ট্যাম্পস দপ্তর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও নিরাপত্তা : সীমান্ত অতিক্রমকারী সব পার্সেলের জন্য ইলেকট্রনিক অগ্রিম তথ্য এবং যাচাইকরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যাতে অবৈধ লেনদেন বা অপব্যবহার প্রতিরোধ সম্ভব হয়।

ডিজিটাল আর্থিক সেবা : ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক ও ডাক জীবন বীমাকে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টিযুক্ত ‘অধিকারী ডাকসেবা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যা দেশের সাধারণ মানুষের সঞ্চয় ও বীমা ব্যবস্থায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। প্রবাসী ভোটারদের জন্য পোস্টাল ব্যালট : নতুন অধ্যাদেশে প্রবাসী ও অনিবাসী ভোটারদের জন্য পোস্টাল ব্যালট সেবা নিশ্চিত করা হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের সুযোগ আরও প্রসারিত করবে।

ঠিকানা আর্কাইভিং ও জলবায়ু অভিযোজন : নাগরিকদের ঠিকানা ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ ও জিও-ফেন্সিং সুবিধা যুক্ত করার মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন বা স্থানচ্যুতিজনিত পরিস্থিতিতেও স্থায়ীভাবে ঠিকানা পুনঃপ্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com