

খুলনার ৬টি সন্ত্রাসী বাহিনীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে নগরবাসী। এলাকায় অধিপাত্য বিস্তার ও মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে গেল বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত তাদের হাতে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন অর্ধশত ব্যক্তি। পুলিশের কার্যক্রম স্বাভাবিক না হওয়া এবং র্যাবের ঝিমিয়ে পড়া অভিযানের কারণে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এসব সন্ত্রাসী বাহিনী। প্রতি রাতে খুনোখুনির সংবাদে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, খুলনায় বর্তমানে ৬টি সন্ত্রাসী গ্রুপ আধিপত্য বিস্তার নিয়ে প্রতি রাতে খুনোখুনিতে লিপ্ত রয়েছে। এই গ্রুপগুলো হলোÑ গ্রেনেড বাবুর বি কোম্পানি, চরমপন্থি হুমা বাহিনী, আশিক বাহিনী, পলাশ বাহিনী, নুর আজিম বাহিনী ও দৌলতপুর এলাকার আরমান বাহিনী। আরমান এবং নুর আজিম কারাগারে থাকলেও নিজ নিজ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে সেখান থেকেই।
একাধিক সূত্র জানায়, মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে ৫ আগস্টের (২০২৪) পর খুন হয়েছেন অন্তত অর্ধশত মানুষ। মাসে শত কোটি টাকার মাদক বাণিজ্যে ও এলাকায় প্রভাব বিস্তারের লড়াই খুলনায় রক্তাক্ত সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। এসব সন্ত্রাসীর হাতে রয়েছে অত্যাধুনিক অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। ফলে খুলনা অঞ্চলজুড়ে বিরাজ করছে অজানা আতঙ্ক।
সূত্র জানায়, ২১ নভেম্বর রাতে নগরীর লবণচরা থানার মধ্য হরিণটানা এলাকার আজাদ মেম্বারের বাড়ির সামনে রাজু নামের এক মাদক কারবারিকে নুর আজিম ও গ্রেনেড বাবুর সদস্যরা হত্যার উদ্দেশ্যে পরপর ৬টি গুলি করে। ৪টি গুলি রাজুর পিঠে, একটি গলায় এবং একটি বুকের বাম পাশে বিদ্ধ হয়। গুলিবিদ্ধ ওই যুবককে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়। গত রবিবার রাতে খুলনা নগরীর সোনাডাঙ্গা মডেল থানার করিমনগর এলাকায় বাসায় ঢুকে স্ত্রীর সামনে গুলি ও জবাই করে হত্যা করা হয় আলাউদ্দিন মৃধা নামের এক মাদক বিক্রেতাকে।
সূত্রটি আরও জানায়, ৬টি সন্ত্রাসী গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে খুলনায় মাসে অন্তত ৭০ থেকে ১০০ কোটি টাকার মাদক কেনাবেচা হয়। মাদকের এই বিশাল বাজার নিয়ন্ত্রণ নিতে খুলনার শীর্ষ সন্ত্রাসী রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবু (বি কোম্পানি), শেখ পলাশ, নুর আজিম এবং আশিক বাহিনী প্রায় বিরোধে জড়ায়। এর মধ্যে মাদকের অর্ধেকের বেশি একাই নিয়ন্ত্রণ করে গ্রেনেড বাবু।
সূত্র জানায়, পাঁচ শতাধিক সদস্যের বাহিনী নিয়ে খুলনা ও আশপাশের এলাকায় মাদকের সিন্ডিকেট পরিচালনা করে গ্রেনেড বাবু। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ১২ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা প্রস্তুত করে পুরস্কার ঘোষণা করায় বেশিরভাগ সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হলেও গ্রেনেড বাবু ও আশিক এখনও রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ ছাড়া দৌলতপুর, খানজাহান আলী ও আড়ংঘাটা থানা এলাকায় মাদক নিয়ন্ত্রণ করছে হুমা বাহিনী ও আরমান বাহিনী। আধিপত্য নিয়ে এই দুই গ্রুপের মধ্যে প্রায়ই খুনোখুনি ঘটে।
সূত্রটি আরও জানায়, খুলনার এই ৬ সন্ত্রাসী বাহিনীর প্রধানরা ৫ (২০২৪) আগস্টের আগে খুলনার আলোচিত শেখ বাড়ির শেল্টারে ছিল।
কেএমপির সহকারী পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া অ্যান্ড সিপি) ত.ম. রোকনুজ্জামান বলেন, মাদকের আধিপত্য বিস্তার নিয়েই প্রতি রাতে খুন-খারাপির ঘটনা ঘটছে। বিগত সরকার পতনের পরপর পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় ৬টি সন্ত্রাসী বাহিনীর তৎপরতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। চোরাচালানের মাধ্যমে আসা মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তারা খুন-খারাপি করে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান রয়েছে।
ছুরিকাঘাতে তরুণ নিহত
খুলনায় বিরোধের জেরে ‘প্রতিপক্ষের’ ছুরিকাঘাতে এক তরুণ নিহত হয়েছে। খালিশপুর থানার ওসি মীর আতাহার আলী জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর খালিশপুর ফেয়ার ক্লিনিকের মোড় এলাকায় ওই তরুণের ওপর হামলা হয়। পরে নগরের সিটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
নিহত ২১ বছর বয়সী ইশান নগরের মুজগুন্নী পেটকা বাজার এলাকার বাসিন্দা মাছ ব্যবসায়ী সহিদুজ্জামান বাচ্চুর ছেলে। পুলিশ বলছে, পেটকা বাজার এলাকায় বেশ কিছুদিন ধরে স্থানীয় দুই কিশোর দলের মধ্যে বিরোধ চলছিল। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আবারও তাদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। এর জেরে প্রতিপক্ষ ইশানের ওপর হামলা ও ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে রাস্তার পাশে ফেলে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা। ছুরিকাঘাতে আরও একজন আহত হয়েছেন।