

জুলাই আন্দোলন চলাকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে সিএনজি অটোরিকশা চালক সবুজ হত্যা মামলায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালসহ ৩০ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছে পুলিশ। অন্যদিকে রাজধানীর মিরপুরে ছাত্রদলের সাবেক নেতা মোহাম্মদ শামীম পারভেজের ফ্ল্যাটে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগের মামলায় শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান (ম খা) আলমগীরসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছে পুলিশ।
সবুজ হত্যা মামলায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদপুর থানার এসআই মো. মাজহারুল ইসলাম গত ৪ ডিসেম্বর এ চার্জশিট দাখিল করেন। আগামী ২২ ডিসেম্বর চার্জশিটটি আদালতে উপস্থাপন করা হবে এবং সেদিন শেখ হাসিনাসহ পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হতে পারে বলে জানা গেছে। চার্জশিটে ৩০ আসামির মধ্যে শেখ হাসিনাসহ ১৬ জনকে পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অবশিষ্ট ১৪ জন হত্যায় সরাসরি সহযোগিতা করেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। চার্জশিটভুক্ত অপর আসামিদের মধ্যে রয়েছেন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক দুই সংসদ সদস্য নুরনবী চৌধুরী শাওন ও সাদেক খান, ২৯নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর সলিমুল্লাহ সলু, ৩২নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর সৈয়দ নূর ইসলাম রাস্টন, ৩৪নং ওয়ার্ডের শেখ মোহাম্মদ খোকন, ঢাকা উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি বজলুর রহমান ও সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক রানা, মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুস সাত্তার ভুইয়া, ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সভাপতি রিয়াজ মাহমুদ, মুহাম্মদ বদিউল আলম বদিউজ্জামান, ফুরকান হোসেন ও শাহজাহান খান, সাবেক কাউন্সিলর আসিফ আহমেদ ও তারেকুজ্জামান রাজীব, জাহাঙ্গীর কবির নানকের পিএস মাসুদুর রহমান বিপ্লব, মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রলীগ সভাপতি নাইমুর রহমান রাসেল, আওয়ামী লীগ নেতা আনিসুর রহমান কাবুল, মারূফুল ইসলাম বিপ্লব, সেন্টু, মনির চৌধুরী, ফারুক খান অভি, আবুল কাশেম কাশু, শান্তা স্টোরের মালিক সেলিম, ছাত্রলীগ নেতা আইমান ওয়াসেফ ওরফে অমিক, কামরুজ্জামান রুবেল এবং মিলন হোসেন।
মামলার এজাহারে শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের ও কামালের নাম না থাকলেও তদন্তে নাম আসায় তাদের চার্জশিটভুক্ত করার কথা বলেছেন তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদপুর থানার এসআই মো. মাজহারুল ইসলাম। চার্জশিটে ৮০ জনকে অব্যাহতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আর সাক্ষী হিসেবে ৪৬ জনের নাম দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
চার্জশিটে বলা হয়, ‘আন্দোলন দমনে শিথিলতা প্রদর্শন করায় এসব আসামি কোথাও কোথাও আওয়ামী লীগের দলীয় কমিটি ভেঙে দিয়েছে। এ ছাড়া তারা একাধিকবার গোপন মিটিং করে নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেনÑ তারা যেন সর্বশক্তি দিয়ে আন্দোলন প্রতিহত করেন।’
অভিযোগপত্রে সবুজ হত্যার ঘটনায় কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ তা তুলে ধরেছেন তদন্ত কর্মকর্তা। এতে কোটা সংস্কার থেকে সরকার পতনের আন্দোলনের পর্যায়ক্রমে নেওয়া বিভিন্ন কর্মসূচি ও সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের বর্ণনাও দেওয়া হয়। চার্জশিটে আরও বলা হয়, হত্যাকাণ্ডের প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরতে গিয়ে তৎকালীন
সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার বক্তব্য, ছাত্রলীগের হামলা, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, আগুন, বিভিন্ন স্থানে গুলিতে হতাহত ও ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এ সংক্রান্ত প্রকাশিত তথ্য ও ভিডিওর ভিত্তিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ চার্জশিটে নাম আসা অন্য মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের বক্তব্য ও নির্দেশের তথ্য ধরা হয়েছে।
চার্জশিটে আরও বলা হয়, মোহাম্মদপুরের লাউতলায় ভাড়া বাসায় থাকতেন নিহত সবুজ। ৪ আগস্ট বিকালে বাসা থেকে হেঁটে বসিলা তিন রাস্তার মোড় থেকে আল্লাহ করিম মসজিদের দিকে আসছিলেন তিনি। ৪টার দিকে ময়ূর ভিলার সামনে গুলিবিদ্ধ হলে বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে তাকে এক পথচারী তার বোন সীমার স্বামী আল ইসলামকে ফোন করে জানান, সবুজ গুলিবিদ্ধ হয়েছে। তাকে শিকদার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। খবর পেয়ে সীমা এবং তার বড় ভাই হাফেজ মুন্সী হাসপাতালে গিয়ে সবুজকে অক্সিজেন চলা অবস্থায় দেখতে পান। সন্ধ্যার দিকে তার অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত সাড়ে ১১টার দিকে মারা যান সবুজ। পরদিন বিকাল ৬টার দিকে তাকে গ্রামের বাড়ি লালমোহনে নিয়ে দাফন করা হয়।
মামলায় বলা হয়, রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ময়ূর ভিলার সামনে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট গুলিতে আহত হওয়ার পর হাসপাতালে মারা যান ২২ বছরের সিএনজি অটোরিকশা চালক মো. সবুজ। এ ঘটনায় ১ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুর থানায় ৯৮ জনের নাম দিয়ে এবং কারও নাম না দিয়ে ৪৫০-৫০০ জনকে আসামি করে মামলা করেন নিহতের ভাই মনির হোসেন।
অন্যদিকে ছাত্রদলের সাবেক নেতা মোহাম্মদ শামীম পারভেজের ফ্ল্যাটে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগের মামলায় বলা হয়, শেখ হাসিনা ও মহীউদ্দীন খান আলমগীরের নির্দেশে ছাত্রদলের সাবেক নেতা শামীম পারভেজের ফ্ল্যাটে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়।
শামীম পারভেজের স্ত্রী জান্নাত আরা ফেরদৌস ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে ফ্ল্যাটে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগে ২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মিরপুর থানায় মামলা করেন। তদন্ত শেষে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মিরপুর থানার উপপরিদর্শক মাহমুদুন্নবী চার্জশিট দাখিল করেন।
চার্জশিটের অন্য আসামিরা হলেনÑ রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা দেওয়ান আব্দুল মান্নান, মীর জসিম উদ্দিন, তৌহিদুল ইসলাম খান শিপলু, এস এম কিবরিয়া পিয়াস, মো. মামুন মিয়া ওরফে শাহজাহান, মনসুর আলী, ইসলাম ওরফে নিক্কন, নুরুল হক, আব্দুল হামিদ ওরফে লিটন ওরফে বগা লিটন, বিপুল পাটোয়ারী, মো. মিজানুর রহমান আখন, জিয়াউল হাসান জিয়া, মো. শহিদুল ইসলাম রজব, আনোয়ার হোসেন আনু, ইয়ানুহা চৌধুরী, এম আয়নাল আহামেদ, জালাল দেওয়ান, সাঈদ ইকবাল ওরফে ভাস্কর, মো. সামসুল হক, মো. ইসমাইল হোসেন সিরাজী প্রধান ও মো. আনোয়ার হোসেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়, ছাত্রদলের সাবেক নেতা ও সরকারি বাঙলা কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি শামীম পারভেজ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে ২০১৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশে বাদীর বাড়িতে হামলা চালানো হয়। শেখ হাসিনা ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ম খা আলমগীরের নির্দেশে অপর আসামিরা ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে প্রবেশ করে আসবাব ভাঙচুর ও লুটপাট করে। ২২টি ল্যাপটপ, ১৭টি স্মার্টফোন, আনুমানিক ২০ ভরি স্বর্ণালংকার এবং নগদ ৯ লাখ টাকা লুট করা হয়। এ ছাড়া নাবালকসহ ৫৪ জন ভাড়াটেকে আটক ও মারধর করা হয়।