সোমবার, ০৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৪:৫৬ পূর্বাহ্ন

নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা এবং অতঃপর

রাজেকুজ্জামান রতন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৮৪ বার

নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরদিন একজন প্রার্থী গুলিবিদ্ধ হওয়াকে কোনো স্বাভাবিক বিষয় বলে মনে করা কঠিন। সংশয় আর উত্তেজনা যেন পিছু ছাড়ছেই না। সংশয় নির্বাচন নিয়ে আর উত্তেজনা রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে। এতদিন সংশয় ছিল নির্বাচন হবে কি না এই প্রশ্নে। আর এখন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে কীভাবে অংশ নেবে, প্রচার করবে এবং নির্বাচনের ফল কী হবে? আর সেই ফলাফল কীভাবে গ্রহণ করবে সেই বিষয় নিয়ে ভাবনায়। নির্বাচন গণতন্ত্রের চর্চার বিষয় হিসেবে না দেখে, যেকোনো মূল্যে বিজয় অর্জন করা বা প্রতিপক্ষকে যেকোনোভাবে হারিয়ে দেওয়াই মুখ্য হয়ে থাকে। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নির্বাচন এলে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো ভোটারদের কীভাবে প্রভাবিত করবে কিংবা কীভাবে প্রলুব্ধ করবে অথবা কীভাবে আতঙ্কিত করবে এই নিয়ে নির্বাচনী পরিকল্পনা সাজিয়ে থাকে। প্রতিবারের মতো এসব বিষয় তো আছেই, এর সঙ্গে হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়া উত্তেজনায় নতুন মাত্রা তৈরি করল। গত ১১ ডিসেম্বর বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ও বাংলাদেশ বেতারে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন সিইসি। নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ১৩তম সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ২৯ ডিসেম্বর। মনোনয়নপত্র বাছাই হবে ৩০ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত। রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল দায়েরের শেষ তারিখ ১১ জানুয়ারি। আপিল নিষ্পত্তি হবে ১২ থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি। রিটার্নিং কর্মকর্তা চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে প্রতীক বরাদ্দ করবেন ২১ জানুয়ারি। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হবে ২২ জানুয়ারি। প্রচার চালানো যাবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটা পর্যন্ত। আর ভোট গ্রহণ হবে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।

নিয়ম অনুযায়ী ইসিতে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোই কেবল দলীয় প্রতীকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারে। এখন ইসিতে নিবন্ধিত দল আছে ৫৬টি। এর মধ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত  রয়েছে। নিবন্ধন স্থগিত থাকা দল নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। নিবন্ধিত সব দল নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে। দল ছাড়াও প্রার্থী হওয়ার যোগ্য যেকোনো ব্যক্তি স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে পারেন।  অতীতের ১২টি জাতীয় নির্বাচনের পর এবার ১৩তম নির্বাচন জাতীয় ইতিহাসে অনন্য ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে চারটি কারণ তুলে ধরে সিইসি বলেন, প্রথমত, এটি হতে যাচ্ছে প্রকৃত গণতান্ত্রিক ধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পাশাপাশি কাক্সিক্ষত সংস্কার প্রশ্নে সিদ্ধান্তের নির্বাচনে। নানা বিতর্কের পর  এবার জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে, যা ভোটার এবং নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি নতুন অভিজ্ঞতা হিসেবে বিবেচিত হবে। দ্বিতীয়ত, বিগত ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনী দৃষ্টান্তের পর নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সব রাষ্ট্রীয় ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের জন্য এই নির্বাচন হচ্ছে সক্ষমতা প্রমাণ করে ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের অনন্য সুযোগ। নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারে এ কথা বিশ্বাস করতে দেশের জনগণ যেন ভুলেই গিয়েছেন। এবার ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের পালা।  তৃতীয়ত, দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের পর দেশের স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সৌহার্দপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার ধারা প্রবর্তনের দাবি রাখে এই নির্বাচন। মারমুখী নির্বাচন, বর্জনের নির্বাচন আর দোষারোপের নির্বাচনের বিপরীতে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখতে চাইবে দেশের মানুষ। নির্বাচন কমিশন এবং অন্তর্বর্তী সরকার সেই চাওয়াকে কতটা পূরণ করতে পারে তা দেখতে চাইবে দেশের জনগণ। চতুর্থত, প্রায় অকার্যকর পোস্টাল ভোটব্যবস্থাকে কিছুটা পরিবর্তন পরিমার্জন করে এই নির্বাচনে একটি কার্যকর রূপ দেওয়া হচ্ছে। ফলে ভোটকেন্দ্রে বা দেশে না থেকেও নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা নির্বাচনে নতুন মাত্রা যুক্ত করবে।

সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন জনগণের দীর্ঘদিনের চাওয়া। প্রতি বছর শ্রম বাজারে নতুন ২২ লাখ শ্রমশক্তি যুক্ত হয়। তাহলে ভোটারের সংখ্যাও সেই পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। অবশ্য দেশের বাইরে চলে যাওয়া, মৃত্যুবরণ করা ইত্যাদি কারণে একই পরিমাণ ভোটার বৃদ্ধি পাবে না, এটা সত্যি। কিন্তু পাঁচ বছর পরপর নির্বাচন হলে একটা বিপুল সংখ্যক ভোটার বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। তাই ভোটার তালিকা প্রণয়ন নিয়মিত ঘটনা। এবার  নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি বাদ পড়া প্রায় ৪৫ লাখ ভোটারকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ২১ লাখের বেশি মৃত ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বাদ পড়া নারী ভোটারদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে নারী-পুরুষ ভোটারের ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা হয়েছে। এর পাশাপাশি ভোটার তালিকা আইন সংশোধন করা হয়েছে। এর ফলে গত ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে ভোটার হওয়ার যোগ্য তরুণ ভোটাররা ভোট দিতে পারছেন। গত ১৮ নভেম্বর প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী বর্তমানে দেশে ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭ এবং নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন। ভোটারের সংখ্যা সুনির্দিষ্ট করার পাশাপাশি ইসির সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশন। সবার জবাবদিহি বাড়াতে আইনি ও কাঠামোগত সংস্কার করা হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনসংক্রান্ত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণবিধিমালা সংশোধন ও পরিমার্জন করা হয়েছে। নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের বিভিন্ন সুপারিশের পাশাপাশি ইসির নিজস্ব মূল্যায়ন ও অংশীজনের পরামর্শের ভিত্তিতে এসব সংস্কার করা হয়েছে। ফলে নির্বাচনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কমিশন প্রস্তুত বলে জানানো হয়েছে। এসব শুনে এবং তফসিল ঘোষণার ফলে নানা জল্পনা-কল্পনা শেষে দেশের মানুষ ভাবতে শুরু করেছে যে, নির্বাচন হচ্ছে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির ঘোষিত সময়ে।

কিন্তু কিছু সংশয় তো আছেই। নির্বাচন কি সুষ্ঠু হবে? এই প্রশ্ন ঘুরছে সবার মনে। ১৫ বছর ব্যাপী আন্দোলন ও সুষ্ঠু নির্বাচন না হওয়ায় যে সন্দেহ জন্ম নিয়েছে তা দূর করা একটু কঠিন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দমন পীড়ন মোকাবিলা করে অভ্যুত্থানের পর যেন প্রতিশোধের আগুন জ¦লে উঠেছিল। দরকার ছিল একে নিয়ন্ত্রণ করা কিন্তু নিয়ন্ত্রণ না করার ফল দেশের মানুষ ভোগ করছেন আরও কতদিন ভুগতে হবে কেউ জানে না। প্রতিপক্ষকে হয়ারানি করার মানসিকতা থাকলে যেকোনো সুযোগেই তা করা যায়, পুলিশ প্রশাসনকে কাজে লাগানো যায়, প্রতিপক্ষকে একটা ট্যাগ লাগিয়ে হয়রানি করা যায় এর চূড়ান্ত ও নোংরা রূপ দেখছে মানুষ প্রতিদিন। কিন্তু মানুষের আশা ছিল এই মানসিকতা পাল্টাবে, প্রবণতা বন্ধ হবে। অপরাধ কেউ করলে তার বিচার হবে। কিন্তু আঘাত এলো জাতীয় সংগীত, মুক্তিযুদ্ধ, নারী, সুফিবাদী, মাজার এবং সমাজের দীর্ঘদিনের সংহতির ওপর। দুর্বলের ওপর প্রশাসনের সহায়তা বা নির্লিপ্ততায় এ ধরনের আক্রমণ বেড়েই চলেছে। নির্বাচনে এর কি প্রভাব পড়বে না? নির্বাচন মানে শুধু ভোট দেওয়া আর ভোট নেওয়া নয়। নির্বাচন হওয়ার কথা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অঙ্গ। রাজতন্ত্রে রাজা, বাদশাহ, সম্রাটরাই ছিলেন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। সব ক্ষমতা এক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত থাকলে স্বেচ্ছাচারের জন্ম ও বিকাশ ঘটে। মানুষ এর পরিবর্তন চায়। ফলে ক্ষমতা বিকেন্দ্রিকরণ করতে চেয়েছে মানুষ। পরবর্তীকালে বলা হয় জনগণের সম্মতি নিয়ে, জনগণের প্রতিনিধি দিয়ে জনগণকে শাসন করার পদ্ধতির নাম নির্বাচন। কিন্তু যাই বলা হোক না কেন, অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, ব্যবস্থা বদল নয়; প্রতি পাঁচ বছর পরপর শাসক নির্বাচনের নাম দাঁড়িয়েছে নির্বাচন এবং এটাকেই বলা হচ্ছে গণতন্ত্র।

তাহলে জনগণ কী নির্বাচন করবেন? কোন পদ্ধতি না কোন ব্যক্তি? ব্যক্তি আসবে, ব্যক্তি যাবে, সে কথা ভেবে পদ্ধতির ওপর জোর দেওয়া হয় বেশি। পদ্ধতিই পারে ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারী হওয়ার পথে লাগাম টেনে ধরতে। যখন পদ্ধতিকে নষ্ট করে দেওয়া হয় তখন নির্বাচন হয়ে দাঁড়ায় প্রহসনমাত্র। নিজের মতো করে নির্বাচন করে নিজেদেরই ক্ষমতায় রাখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। ফলে নির্বাচনে নয়, অভ্যুত্থান ছাড়া ক্ষমতা থেকে অপসারণ করা যায়নি কোনো স্বৈরাচারীকে। প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, অভ্যুত্থানের পর কী হবে? অভ্যুত্থানের আগে এবং পরে কী অবস্থা একই থাকবে? না কি সুষ্ঠু নির্বাচন পদ্ধতি চালু হবে, ভোটের সংস্কৃতি এবং ভোটারের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে? নির্বাচন ছাড়া শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের আর কোনো গ্রহণযোগ্য পথ কি খোলা আছে? তাহলে নির্বাচনে কারা প্রধান অংশীজন। ভোটার না প্রার্থী? এবার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে কিছু নতুন বিধানের নামে নতুন বাধা তৈরি করা হয়েছে। নির্বাচনে প্রার্থী হতে হলে জামানতের পরিমাণ ২০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। ভোটার প্রতি খরচ ১০ টাকা অর্থাৎ একটি সংসদীয় এলাকায় ৪ লাখ ভোটার থাকলে প্রার্থী ৪০ লাখ টাকা খরচ করতে পারবেন।  টাকার পরিমাণ বৃদ্ধি কতটা হয়েছে সেটা যেমন গুরুত্বপূর্ণ তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনকে টাকাকেন্দ্রিক করে তোলার প্রবণতা। যা টাকার খেলাকে উৎসাহিত করে নির্বাচনকে টাকার অধীন করে ফেলা হয়েছে। ফলে দেশ এখন দুই ভাগে বিভক্ত। একদল প্রার্থী আর অন্যভাগে বিপুল সংখ্যক ভোটার। যারা কখনই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, সামাজিক আন্দোলনের অভিজ্ঞতা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকলেও টাকা নেই বলে নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। তাদের ভোটার হওয়ার যোগ্যতা থাকবে, কিন্তু প্রার্থী হওয়ার ক্ষমতা থাকবে না। এর সঙ্গে যদি যুক্ত হয় ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার তাহলে নির্বাচন গণতন্ত্র থেকে বহুদূরে চলে যাবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রয়োজন গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও গণতন্ত্রের চর্চা। অভ্যুত্থানের পরও যদি তা তৈরি না হয়, তাহলে মানুষের মধ্যে না পাওয়ার বেদনা এবং হতাশা তৈরি হবে। এ থেকে মুক্ত করতে তফসিল ঘোষণার পর থেকেই টাকা, পেশিশক্তি ব্যবহার বন্ধ করা না গেলে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক পরিবেশ অর্জিত হবে না। এই নেতিবাচক আশঙ্কার পরিবর্তে ইতিবাচক পরিবর্তনের পথে নির্বাচন কমিশন কি হাঁটবে না? এই আশাবাদ নিয়ে মানুষ অপেক্ষায় থাকবে কত দিন?

লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com