

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল ‘গণযুদ্ধ’। এখানে ‘প্রফেশনাল’ যুদ্ধের শর্ত পূরণ করে ‘অ্যাকশনে’ যাওয়া হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের সব অ্যাকশন ছিল গেরিলা পদ্ধতির। সাধারণ মানুষ ব্যাপকভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। কৃষক, জেলে, তাঁতি, কামার, কুমার, ছাত্র, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিককর্মীসহ সব শ্রেণি পেশার মানুষ মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলেন। দেশ স্বাধীন করতে নিজের সর্বোচ্চটুকু দিয়েছেন। কোনো গ্রাম বা এলাকা তখন নিরাপদ ছিল না। পাকিস্তানি বাহিনী সব জায়গায় ত্রাস সৃষ্টি করেছে। লুটপাট করেছে। আগুন দিয়েছে। গ্রামের মানুষ সাদরে গ্রহণ করেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের। তারা জায়গা দিয়েছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের খাবারের ব্যবস্থা করেছেন এবং খবরাখবর আনা-নেওয়ার কাজ করেছেন। দিন বা রাতে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গেছেন। যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেই, হাতে অস্ত্র নেই, গায়ে যোদ্ধার পোশাক বা পায়ে জুতা নেই। তবু সেই সাধারণ মানুষ রওনা হয়ে গেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে গোলাবারুদের ভারী ব্যাগ হাতে। রাজাকাররা মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজ পেলে পাকবাহিনীর কাছে গিয়ে বলে দিত। কেউ দেখে ফেলতে পারে, সেই আশঙ্কায় মুক্তিযোদ্ধারা সম্মুখযুদ্ধ ছাড়া ঘরের বাইরে বের হতেন না। এমনকি অনেকে দিনের বেলা গোসলও করতেন না। রাতে বের হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা গেরিলা হামলা চালাতেন। বেশিরভাগ সময় পরনের ভেজা কাপড় শরীরেই শুকাতেন। না হয় কোনো সময় আগুনে শুকিয়ে নিতেন। এক কাপড়ে কাটাতে হয়েছে মাসের পর মাস। মুক্তিযোদ্ধারা কখনো দল ধরে একই গ্রাম কিংবা এক বাড়িতে থাকতেন না। কারণ এর সঙ্গে নিরাপত্তার ব্যাপার জড়িত ছিল। দেশ স্বাধীন করার জন্য সাধারণ মানুষই লড়ে গেছেন মুক্তির লড়াই। এখানে মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ পাঁচজন মানুষের কথা উল্লেখ করা হলো।
তাগড়া : সবাই তাকে তাগড়া নামে ডাকে। সমুদ্র উপকূলের চরাঞ্চলে তার বাড়ি। বাবা-মায়ের দেওয়া নাম হারিয়ে গেছে সেই কবে। বয়স ছাব্বিশ বছর। চর দখলের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেয়। সুন্দরবন এলাকা থেকে একদল মুক্তিযোদ্ধা বরিশালের দিকে যাচ্ছেন। দীর্ঘ পথচলায় তারা ক্লান্ত। কখনো নৌকা, কখনো গরুর গাড়ি বাকি পথ পায়ে হাঁটা। মুক্তিযোদ্ধা দল এসে পৌঁছায় কোদালধোয়। সুন্দরবনের পাশের একটি গ্রাম। ঠিক তখনই আচমকা অপরদিক থেকে এগিয়ে আসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি দল। সহসা শত্রুর মুখোমুখি পড়ে গেছে মুক্তিযোদ্ধা দল। শুরু হয়েছে গোলাগুলি। অবিশ্রান্ত গোলাগুলি চলেছে অনেকক্ষণ। তারপর সব চুপচাপ। সুনসান চারপাশ। খানিকবাদে সামনে এগিয়ে এলো এক বিশালদেহী পাকিস্তানি সৈনিক। তার হাতে এসএমজি। কেউ তাকে গুলি করেনি। হঠাৎ সে চিৎকার করে উঠল, ‘হ্যায় কোয়ি মা কি লাল? মা কি দুধ পিয়া হো তো বেগায়ের হাতিয়ারকে সামনে আ যাও।’ (আছ কোনো মায়ের ছেলে? মায়ের দুধ যদি খেয়ে থাক, তাহলে বিনা অস্ত্রে সামনে এগিয়ে এসো)। এই কথা শেষ করে সেই পাকিস্তানি সৈন্য তার হাতের এসএমজি ছুড়ে ফেলে দিল। তারপর একটানে ইউনিফর্মের শার্টের বোতাম ছিঁড়ে ফেলল। গা থেকে শার্ট খুলে সেটাও ছুড়ে ফেলে দিল। সে এগিয়ে আসছে সামনে। সেখানে ছিল তাগড়া। পরনে লুঙ্গি। উদোম গা। তার আর সহ্য হলো না। শত্রুসেনা মল্লযুদ্ধে আহ্বান জানিয়েছে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তাকে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। দাঁড়িয়ে পড়ল তাগড়া। লুঙ্গির কোঁচা গুঁজতে গুঁজতে সে চিৎকার করে বলল, ‘মর্দো মনে হরছে কী? বাঙালিগো মধ্যে কি কেউ নাই যে, ওর লগে বোঝতে পারে? মেবাই (মিয়াভাই) তাগড়ারে আর ধইরা রাখতে পারলেন না। হালার পো হালায় বে-জাগায় হাত দেছে।’ বলে তাগড়া এগিয়ে গেল পাকিস্তানি সেই সৈন্যের দিকে। ওপাশে পাকিস্তানি সৈন্য। এপাশে মুক্তিযোদ্ধা। দুদলই নিঃশব্দ। কোথাও কোনো সাড়া নেই। কয়েক মুহূর্ত তাগড়া আর ওই পাকিস্তানি সৈন্য মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকল। আচমকা তাগড়া তার ডান হাতের খোলা আঙুলের সজোর থাবা বসিয়ে দিল পাকিস্তানি সৈন্যের বাঁ বুকে। প্রচণ্ড থাবার তাল সামলাতে পারল না ওই পাকিস্তানি সৈনিক। পড়তে পড়তে দুই পা পিছিয়ে গেল। তাগড়াও পিছিয়ে এলো কয়েক পা। তখন দুজনের মাঝখানে দূরত্ব প্রায় ১০ হাত। এমন সময় পাকিস্তানি সৈন্যরা গুলি ছুড়ল। তারা গোপন জায়গা থেকে কাপুরুষের মতো গুলি ছুড়েছে তাগড়াকে লক্ষ্য করে। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের কয়েক রাউন্ড গুলি এসে ঝাঁজরা করে দিল তাগড়ার বুক। তাগড়া মুখ থুবড়ে বুকের ওপর ভর দিয়ে মাটির ওপর পড়ে গেল। সে আর নড়েনি। পাকিস্তানি সৈনিক লাফ দিয়ে চলে গেল নিজ আস্তানায়। তারপর ঘটনা ঘটেছে খুব দ্রুত। হাজার হাজার এলাকাবাসী এগিয়ে এলো সামনে। তারা সবাই নিরস্ত্র। তাদের বুকে সাহস আর ক্ষোভ। চোখে আগুন, ক্রোধ। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে সামান্য কয়েকটি অস্ত্র। বীর বাঙালির আক্রমণের মুখে টিকতে পারেনি পাকিস্তানি সৈন্যরা। তারা অনেকেই মারা পড়েছে। বাকিরা বন্দি হয়েছে।
মাহমুদুর রহমান বেনু : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের প্রভাষক মাহমুদুর রহমান বেনু। তিনি নিজের পরিচয় গোপন করে যুদ্ধে গেছেন। সাধারণ সিপাই হিসেবে ভর্তি হয়েছেন ফার্স্ট ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। বেনু মাইন লাগান, ব্রিজ উড়িয়ে দেন। ক্যাম্পের শক্ত মাটিতে শুয়ে রাত কাটিয়ে দেন। প্লাটুন কমান্ডার হাবিলদার তাজুল কীভাবে যেন বেনুর পরিচয় জেনে গেলেন। তিনি এসে দাঁড়ালেন ক্যাপ্টেন হাফিজের সামনে। স্যালুট দিয়ে বললেন, স্যার, একটা কথা জানতে চাই।’ ক্যাপ্টেন হাফিজ বললেন, ‘বলো কী ব্যাপার?’ ‘স্যার, নতুন রিক্রুট নাকি আপনার বন্ধু?’ ‘হ্যাঁ। এতে কিছু যায় আসে না। সে তোমার অধীনস্থ রিক্রুট।’ ‘স্যার, বেনু সাহেব নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। উনাকে অর্ডার দিতে শরম লাগে। কড়া কথাও বলতে পারি না।’ কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক মাহমুদুর রহমান বেনু যুদ্ধের হুকুম নিতে লজ্জাবোধ করেননি, স্বল্পশিক্ষিত একজন হাবিলদারের কাছে। তিনি এসেছেন শত্রুর কবল থেকে বাংলাদেশ মুক্ত করতে। তার জন্য তাকে যত মূল্যই দিতে হোক, কোনো সমস্যা নেই। মূলত এভাবেই পার হয়েছে দীর্ঘ ৯ মাস। এক দিন পরই সেই বিজয়ের দিন। আমরা যেন এই অগ্নিপুরুষদের ভুলে না যাই। যাদের জন্যই আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ। কোনো দল নয়, মানুষই বিজয় স্বপ্নসুন্দর।
লেখক: চাইল্ড কেয়ার ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এডুকেশন কনসালট্যান্ট, ইউনিসেফ