

কোম্পানীগঞ্জ-কবিরহাট উপজেলা ও সদরের দুইটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত জাতীয় সংসদের ২৭৩ নম্বর আসন নোয়াখালী-৫। এ আসনটি সব সময়ই একটি ভিআইপি আসন হিসেবে পরিচিত। এ আসনে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মরহুম ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের কয়েকবার করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বেও ছিলেন। দু’জনেই দেশের দু’টি বৃহৎ দলের শীর্ষ নেতা। এদের মধ্যে একজন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এখন প্রয়াত। অন্যজন ওবায়দুল কাদের ৫আগস্ট গণ অভ্যুত্থানের পর দেশ থেকে পালিয়ে গেছেন। এ দু’হেভিওয়েট প্রার্থীর মধ্যে সব সময় নির্বাচনী জয়-পরাজয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা থাকতেন।
বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের মৃত্যুর পর গত দুইটি নির্বাচনে এ আসনে ছিলো না রাজনৈতিক উত্তেজনা। গত দুইটি নির্বাচনে রাজনৈতিক উত্তেজনা ছাড়ায়ই বিনা ভোটের নির্বাচনে জয়ী হন আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। যদিও এ জয় তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার প্রশ্নবিদ্ধ।
৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর আবারও নির্বাচনী আমেজ দেখা যায় এ আসনে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার লক্ষ্যে মাঠে নোয়াখালী-৫ আসনে প্রচার-প্রচারনা চালিয়ে আসছে বিএনপির ধানে শীষের প্রার্থী শিল্পপতি আলহাজ্ব ফখরুল ইসলাম ও জামায়াত ইসলামের দাঁড়ীপাল্লার প্রার্থী অধ্যক্ষ বেলায়েত হোসেন। এ দু’জন এ আসনের ১৫৫টি ভোট কেন্দ্র এলাকায় (কোম্পানীগঞ্জ, কবিরহাট উপজেলা ও সদরের দুইটি ইউনিয়ন) ব্যাপক প্রচার-প্রচারনা চালিয়ে আসছেন। তাদের পক্ষে পথে-প্রান্তরে, গ্রামে-গ্রামে গিয়ে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে নেতাকর্মীরা কাজ করে যাচ্ছেন।
নোয়াখালী-৫ (কোম্পানীগঞ্জ-কবিরহাট ও সদরের একাংশ) আসনে বিএনপির প্রয়াত ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ সংসদ সদস্য এবং নানা মন্ত্রনালয়ে দায়িত্ব থাকার সময় ব্যাপক উন্নয়ন ও তার ব্যক্তিগত ইমেজকে কাজে লাগিয়ে বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী শিল্পপতি আলহাজ্ব ফখরুল ইসলাম ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছেন। বিগত দিনগুলোতে এ আসনে বিএনপির মধ্যে অন্তকোন্দল ও বিভিন্ন গ্রুপ ছিল। গ্রুপিং নিরসনের জন্য নির্বাচনী প্রচারের পাশাপাশি দলকে সুসংগঠিত করার কাজও চালাচ্ছে বিএনপি। নির্বাচনী প্রচারে বিগত দিনগুলোতে এ আসনে বিএনপি প্রার্থী ফখরুল ইসলামের ব্যক্তিগত সাহায্য-সহযোগিতা ও অনুদানের বিষয়গুলো মাঠে তুলে ধরছেন নেতাকর্মীরা।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আবদুল হাই সেলিম বলেন, ‘এ আসনে বিএনপির প্রয়াত ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ সর্বক্ষেত্রে যে উন্নয়ন করেছেন, তাকে লক্ষ্য করে এলাকার সাধারণ ভোটারেরা উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে শিল্পপতি আলহাজ্ব ফখরুল ইসলামকে ধানের শীষে নির্বাচিত করবেন বলে আমরা দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করি।’
বসুরহাট পৌরসভার সাবেক মেয়র ও পৌরসভা বিএনপির সভাপতি কামাল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘মরহুম ব্যারিস্টার মওদুদের মৃত্যুর পর দলকে গুছিয়ে নেওয়া, এলাকা ভিত্তিক নানাবিধ সামাজিক কাজ, যোগ্যদের কর্মসংস্থান করায় ফখরুল ইসলাম দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ঈর্ষণীয় অবস্থানে রয়েছেন। এ নিরিখে তিনি এ আসনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন। ব্যক্তি বড় নয়, নির্বাচনের মাঠে আমরা ধানের শীষের প্রার্থী আলহাজ্ব ফখরুল ইসলামকে বিজয়ী করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করব।’
বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী আলহাজ্ব ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘বিএনপির জন্য দীর্ঘদিন মাঠ পর্যায়ে কাজ করে আসছি। একজন রাজনৈতিক কর্মী ও সমাজকর্মী হিসেবে নির্বাচনকে ঘিরে এতটুকুই বলতে পারি, আমি এখান থেকে কিছুই নিতে আসিনি। আমি জনগণকে আমার সাধ্যানুযায়ী সবকিছু উজাড় করে দিতে এসেছি। দল আমাকে মনোনয়ন দিয়ে দলের প্রতি আমার দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি নির্বাচিত হলে ঈমানদারির সঙ্গে জনগনের ব্যালটের দেওয়া রায়ের আমনত রক্ষা করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অস্বস্তিজনক অবস্থানে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী। সুসংগঠিত জামায়াতের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ধারণা ছিল কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কোনো নেতা এ ভিআইপি আসনে দল মনোনয়ন দেবে। কেন্দ্রীয় জামায়াতের বর্ষিয়ান নেতা অধ্যাপক আবু নাছের মোহাম্মদ আবদুজ জাহের, ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি লন্ডন প্রবাসী ডা. আমিনুল ইসলাম মুকুল, শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা ও ওয়ার্ল্ড এসেম্বলী অব মুসলিম ইয়থ’র (ওয়ামী) সভাপতি আলমগীর মোহাম্মদ ইউছুফ, ডা. মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেনের মত নেতৃবৃন্দ থাকার পরও অধ্যক্ষ বেলায়েত হোসেনকে মনোনয়ন দেওয়ায় জামায়াতের প্রতিপক্ষ বিএনপির প্রার্থী ফখরুল ইসলাম সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।
জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর অধ্যক্ষ বেলায়েত হোসেন প্রচার-প্রচারণায় অনেকটা এগিয়ে আছেন। দলীয় নানা সভা-সমাবেশ, ঘরোয়া সভাসহ নানা কর্মসূচী এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছে। দলীয় ইমেজ কাজে লাগিয়ে এবং ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থান ও আওয়ামী বিরোধী আন্দোলনকে তুলে ধরে উপজেলা জামায়াতের আমীর অধ্যক্ষ বেলায়েত হোসেন দাঁড়িপাল্লা প্রতিকে ভোট চেয়ে মাঠ সরগরম করে রেখেছেন।
জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী অধ্যক্ষ বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘আমাদের নির্বাচনী কেন্দ্র কমিটিসহ সকল কার্যক্রম মোটামুটি প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। আমরা মাঠে মানুষের কাছে যাচ্ছি, মানুষও সাড়া দিচ্ছেন।’
এদিকে এ আসনে শাপলা কলি প্রতীকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে লড়বেন দলের যুগ্ম সদস্য সচিব ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হুমায়রা নুর। তিনি এ আসনে নতুন মুখ হলেও তার পারিবারিক ও ব্যক্তিগত ইমেজ ভালো। এডভোকেট হুমায়রা নূর নোয়াখালীর অশ্বদিয়া ইউনিয়নের মাইনুদ্দিন হাজী বাড়ির ডা: এবিএম ইয়াহিয়ার মেয়ে ও অশ্বদিয়া গার্লস হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা শামসুল হুদার নাতনী। হুমায়রার মা হলি ফ্যামিলি মেডিকেল কলেজের প্রফেসর ডা. নাজনীন আখতার। এছাড়া তার স্বামী ব্যারিস্টার একেএম এহসানুর রহমান এ আসনের সাবেক এমপি ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদের জুনিয়র এসোসিয়েট ছিলেন।
একই আসনে জাতীয়পার্টি থেকে বসুরহাটের বিশিষ্ট নাগরিক খাজা পরিবারের সন্তান জাতীয়পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা ব্যারিস্টার তানভির আহমেদ রুবেল নোয়াখালী-৫ আসনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে লড়বেন বলে জানা গেছে। এছাড়া জাতীয় সমাজতান্ত্রীক দল (জাসদ) কেন্দ্রীয় নেতা কামাল উদ্দিন পাটোয়ারী। খেলাফত মজলিসের (দেয়াল ঘড়ি) মাওলানা আলী আহম্মদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (হাতপাখা) থেকে আলহাজ্ব মাওলানা আবু নাছেরের নাম চুড়ান্ত করা হয়েছে বলে দলীয়ভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, এ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৯০ হাজার ৯শ ৫৯ জন। তার মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫৫ হাজার এবং মহিলা ভোটার ২ লাখ ৩৫ হাজার ৯শ ৫৯ জন।