বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৮:৪০ পূর্বাহ্ন

জনসমর্থনের ভাষা ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

জান্নাতুল নওরিন উর্মি
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৯৫ বার

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু দিন থাকে, যেগুলো শুধু একটি তারিখে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সময়ের দীর্ঘ প্রবাহে একটি দিকনির্দেশক চিহ্ন হয়ে ওঠে। সেই দিনগুলো স্মৃতিতে রয়ে যায় রাষ্ট্রের, সমাজের এবং রাজনীতির যৌথ অভিজ্ঞতা হিসেবে। ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর তেমনই একটি দিন, যে দিনে ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।

এই প্রত্যাবর্তন নিছক একজন রাজনৈতিক নেতার দেশে ফেরা নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, গণতন্ত্রের সংকট, জনগণের প্রত্যাশা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার এক জটিল সন্ধিক্ষণ সামনে নিয়ে আসে। এই দিনটি তাই শুধু অতীতের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়; বরং নতুন প্রশ্ন, নতুন দায়িত্ব এবং নতুন রাজনীতির সূচনাবিন্দু।

প্রত্যাবর্তনের মুহূর্ত: প্রতীক, আবেগ ও রাজনীতি

‘প্রিয় বাংলাদেশ’—এ দুটি শব্দ দিয়ে শুরু হয় তারেক রহমানের প্রথম বক্তব্য। একটি দেশের সঙ্গে একজন রাজনৈতিক নেতার সম্পর্ক শুধু সাংবিধানিক বা রাজনৈতিক নয়; তা আবেগী, ঐতিহাসিক এবং প্রতীকীও। এ সম্বোধন তাই নিছক বক্তৃতার অলংকার নয়, বরং নিজেকে আবার দেশের রাজনৈতিক পরিসরের কেন্দ্রে স্থাপন করার একটি সচেতন প্রয়াস।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে হঠাৎ থেমে যাওয়া, জুতা খুলে শিশিরভেজা ঘাসে দাঁড়িয়ে দেশের মাটি স্পর্শ করা এবং একমুঠো মাটি হাতে তুলে নেওয়া। এই পুরো দৃশ্যটি ছিল গভীরভাবে প্রতীকী। কোনো ঘোষণা নয়, কোনো উচ্চকণ্ঠ রাজনৈতিক বার্তা নয়। নীরব সেই মুহূর্তেই যেন ধরা পড়ে ১৭ বছরের বিচ্ছেদের বেদনা এবং ফিরে পাওয়ার আনন্দ।

রাজনীতিতে প্রতীক সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এ প্রতীক আরও বেশি শক্তিশালী। কারণ, এখানে আবেগ, স্মৃতি ও ইতিহাস একে অন্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। তারেক রহমানের এই নীরব মুহূর্ত অনেকের কাছে ছিল আবেগঘন, আবার অনেকের কাছে এটি ছিল সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক ভাষা। যার মাধ্যমে তিনি নিজেকে ‘নির্বাসিত’ থেকে ‘প্রত্যাবর্তিত’ নেতায় রূপান্তরিত করলেন।

১৭ বছরের নির্বাসন—ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে রাজনৈতিক বাস্তবতা: ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় চিকিৎসার জন্য তারেক রহমান সস্ত্রীক দেশ ছাড়েন। সেই যাত্রা ছিল নিঃসঙ্গ, কড়া নিরাপত্তায় ঘেরা এবং রাজনৈতিকভাবে প্রায় নির্বাসনের সমতুল্য। সে সময় তার চারপাশে ছিলেন শুধু নিরাপত্তা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। দল, পরিবার, সমর্থক—এ সবকিছুর থেকে বিচ্ছিন্ন এক যাত্রা।

এই ১৭ বছর শুধু একজন ব্যক্তির জীবনের অধ্যায় নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ে দেশে একাধিক নির্বাচন হয়েছে, সরকার বদলেছে, গণতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। এ পুরো সময় তারেক রহমান ছিলেন দেশের বাইরে, কিন্তু দেশের রাজনীতিতে তার নাম অনুপস্থিত ছিল না।

নির্বাসনের এ সময় তার বিরুদ্ধে যেমন নানা অভিযোগ ও সমালোচনা ছিল, তেমনি তার সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন ‘বঞ্চিত’ ও ‘নির্যাতিত’ এক নেতা। এ দ্বৈত বাস্তবতা তার প্রত্যাবর্তনের দিনটিকে আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।

‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’—বক্তব্যের ভাষা ও রাজনৈতিক কৌশল: পূর্বাচলের মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রায় ১৬ মিনিট বক্তব্য দেন তারেক রহমান। এ বক্তব্যে তিনি খুব বেশি কিছু বলেননি। এমনটাই প্রথমে মনে হতে পারে। কোনো বিস্তারিত কর্মসূচি, কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি, কোনো স্পষ্ট রূপরেখা তিনি দেননি। কিন্তু তিনি বারবার উচ্চারণ করেছেন একটি বাক্য—উই হ্যাভ আ প্ল্যান। বক্তব্যের শুরুতে তিনি বলেন—‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’, পরে বলেন—‘উই হ্যাভ আ প্ল্যান’। এই রূপান্তর শুধু শব্দের নয়; এটি রাজনৈতিক দর্শনেরও ইঙ্গিত। ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব থেকে সমষ্টিগত উদ্যোগের দিকে যাওয়ার বার্তা দেওয়ার চেষ্টা এখানে স্পষ্ট।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি অভিযোগ রয়েছে। স্লোগান আছে, আবেগ আছে, কিন্তু সুস্পষ্ট পরিকল্পনার অভাব। তারেক রহমানের বক্তব্য সেই অভিযোগের প্রেক্ষাপটেই নতুন প্রত্যাশা তৈরি করে। তবে পরিকল্পনার কথা বললেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয় না। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং সর্বোপরি গণতান্ত্রিক আচরণ।

একাত্তর ও চব্বিশের ধারাবাহিকতা: তারেক রহমানের রাজনৈতিক বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ১৯৭১ ও ২০২৪ সালের সংযোগ। ১৯৭১ মানে স্বাধীনতা, আত্মপরিচয় ও সার্বভৌমত্ব। আর ২০২৪ মানে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও ন্যায়বিচারের চলমান সংগ্রাম। এ সংযোগের মাধ্যমে তিনি বিএনপির রাজনীতিকে শুধু ক্ষমতার রাজনীতি হিসেবে নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে তুলে ধরতে চান। তার ঘোষিত কর্মসূচিগুলো জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা, শহীদদের কবর জিয়ারত, আহতদের খোঁজ নেওয়া—এ ইতিহাসচেতন রাজনীতিরই প্রকাশ। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—ইতিহাস কি শুধু প্রতীক ও স্মৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তা বর্তমানের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হবে?

‘সবার আগে বাংলাদেশ’—স্লোগান থেকে বাস্তবতা: তারেক রহমান যে বাসে করে সমাবেশে গেছেন, সেই বাসে লেখা ছিল—‘সবার আগে বাংলাদেশ’। এই স্লোগান নতুন নয়, কিন্তু এর অর্থ সবসময় নতুন করে ব্যাখ্যার দাবি রাখে। সবার আগে বাংলাদেশ মানে কি দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া? মানে কি ভিন্নমতকে সহনশীলতার সঙ্গে গ্রহণ করা? মানে কি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা?

এ প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে, এ স্লোগান শুধু একটি রাজনৈতিক বাক্য হয়ে থাকবে, নাকি তা বাস্তব রাজনীতির দিকনির্দেশনায় পরিণত হবে।

পরিকল্পনার পরীক্ষা: ২৫ ডিসেম্বরের দিনটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্মরণীয় হয়ে থাকবে, এতে সন্দেহ নেই। তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন আবেগ, আশা ও প্রত্যাশার এক বিরল সংমিশ্রণ তৈরি করেছে। তিনি বলেছেন—আই হ্যাভ আ প্ল্যান। এখন দেশের মানুষ দেখবে, সেই পরিকল্পনা কী, কার জন্য এবং কীভাবে তা বাস্তবায়িত হবে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, মানবিকতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ—এ চারটি স্তম্ভের ওপর যদি সেই পরিকল্পনা দাঁড়ায়, তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অন্যথায়, এই ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনও হয়তো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আবেগের স্মৃতিতে রূপ নেবে—যেমনটি অতীতে বহুবার হয়েছে। বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই সন্ধিক্ষণে উচ্চারিত হয়েছে—আই হ্যাভ আ প্ল্যান। এখন সময় এসেছে সেই পরিকল্পনার পরীক্ষার।

লেখক: সহসাধারণ সম্পাদক, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ; শিক্ষার্থী ইউনিভার্সিটি অব হার্টফোর্ডশায়ার, ইউকে

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com