বৃহস্পতিবার, ০৮ জানুয়ারী ২০২৬, ০৫:৩৬ অপরাহ্ন

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১৩ প্রার্থী ঋণখেলাপি

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৫ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১৬ বার

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে ৩০০টি আসনের বিপরীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্রসহ মোট ২ হাজার ৫৭৪ প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন। নির্বাচন কমিশনের অনুরোধে এসব প্রার্থী ঋণখেলাপি কি না, সেই তথ্য ঋণতথ্য ব্যুরো (সিআইবি) থেকে যাচাই-বাছাই করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যাচাই-বাছাইয়ে অন্তত ১১৩ প্রার্থী ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। এর মধ্যে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ (স্টে-অর্ডার) নিয়েছেন অন্তত ৩১ জন। ফলে বাকি ৮২ প্রার্থী ঋণখেলাপির কারণে নির্বাচনের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। তবে তারা চাইলে আপিল করতে পারবেন। আর আপিল শুনানির পরই জানা যাবে তারা চূড়ান্তভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি পারবেন না। এ জন্য অপেক্ষা করতে হবে আপিল শুনানির শেষ দিন পর্যন্ত। গতকাল প্রার্থীদের সিআইবি তথ্য যাচাই সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হয়। এতে ২ হাজার ৪৬১ প্রার্থীকে খেলাপিমুক্ত বলে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন ও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আরিফ হোসেন খান আমাদের সময়কে বলেন, আসন্ন নির্বাচনে মনোনয়ন দাখিলকারী সব প্রার্থীর ঋণের তথ্য যাচাই-বাছাই করার জন্য নির্বচান কমিশন থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছিল। সে অনুযায়ী তাদের সিআইবি তথ্য যাচাই-বাছাই করে সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে একটি প্রতিবেদন নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যারা আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়েছেন, তাদের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে।

গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ঋণখেলাপিরা নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন না। প্রার্থীদের নামে খেলাপি ঋণ থাকলে তা মনোনয়নপত্র দাখিলের আগে নবায়ন বা পরিশোধ করতে হয়। আর যথাসময়ে ঋণ নবায়ন হলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থী নির্বাচনে যোগ্য বলে বিবেচিত হন, অন্যথায় প্রার্থী হতে পারেন না। এ কারণে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কর্মকর্তারাও সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে উপস্থিত থাকেন। এ ছাড়া আপিলের শুনানির সময় নির্বাচন কমিশনেও ঋণখেলাপি প্রার্থীদের ঠেকাতে ব্যাংক কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকেন। এ ছাড়া সংশোধিত আরপিও অনুযায়ী, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরও যদি কারও ঋণখেলাপি হওয়া বা অন্য কোনো মিথ্যা তথ্য দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল করতে পারবে নির্বাচন কমিশন।

সর্বশেষ ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে কৌশলে ঋণখেলাপিদেরও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল। নির্বাচনের ঠিক আগে আকস্মিকভাবে সিআইবির তথ্য আপডেট করার ক্ষমতা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিবর্তে বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখা কর্মকর্তাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। এতে ঋণ পরিশোধ না করেই অনেকেই শাখার ওপর প্রভাব খাটিয়ে তথ্য আপডেট করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। তবে এবার কোনো খেলাপি যেন এ রকম সুযোগ না পান, সে বিষয়ে কঠোর অবস্থানে ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরই অংশ হিসেবে এবার সারা দেশ থেকে তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর নিজ নিজ ব্যাংক তথ্য যাচাইয়ের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিআইবি থেকেও তথ্যের সঠিকতা যাচাই করা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, নির্বাচনে অংশগ্রণ করবেন- এমন অনেক প্রার্থী ঋণখেলাপির তালিকায় ছিলেন। এর মধ্যে কিছু প্রার্থী ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতা করে ঋণ নিয়মিত করে ফেলেছেন। অনেকে চেষ্টা করেও তা পারেননি। কারণ, কিছু প্রার্থী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে। তাই ব্যাংকগুলো চাইলেও এসব ঋণ নিয়মিত করতে পারে না। তাই ওইসব প্রার্থীর ঋণ নিয়মিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকর দ্বারস্থ হতে হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অনেক প্রার্থী আটকে গেছে। তাই তাদের রিপোর্ট সিআইবিতে খারাপ এসেছে।

জানা গেছে, ঋণখেলাপির কারণে এরই মধ্যে জাতীয় পার্টির একাংশের আলোচিত নেতা মুজিবুল হক চুন্নুর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। তিনি কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) আসনে এমপি প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। ঢাকা-২ আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী আব্দুল হকের মনোনয়নপত্রও ঋণখেলাপি হওয়ায় বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া বাগেরহাট-১ (ফকিরহাট, মোল্লাহাট ও চিতলমারি) আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মুজিবুর রহমান শামীম, জাতীয় পার্টির প্রার্থী গোলাম সরোয়ার এবং বাগেরহাট-২ (বাগেরহাট সদর ও কচুয়া) আসনে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রার্থী মো. হাসান ইমাম লিটুর মনোনয়নও ঋণখেলাপির কারণে বাতিল করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ঋণখেলাপি-সংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়। তথ্য গোপন করে কোনো ঋণখেলাপি যেন নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন, সে জন্য নির্বাচন কমিশনের তালিকা ধরে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রার্থীদের তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয়।

এর আগে নির্বাচনে প্রার্থীদের বিষয়ে ব্যাংকগুলো যেন প্রকৃত তথ্য দেয়, সে বিষয়ে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) নির্দেশনা দেওয়া হয়। গত মাসে অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, তথ্য গোপন না করে, এমনকি কোনো সম্ভাব্য প্রার্থীর ‘আনরিপোর্টেড’ বা ‘গোপন ঋণ’ থাকলে তা সিআইবি ডেটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অহেতুক কাউকে যেন হয়রানি করা না হয়, সে নির্দেশনা দিয়ে গভর্নর বলেন, ক্রেডিট কার্ড বা অন্য কোনো ফি পরিশোধ না করার কারণেও কাউকে খেলাপি দেখানো যাবে না।

এর আগে নির্বাচন কমিশনের কাছে সম্ভাব্য সব প্রার্থীর তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠায় বাংলাদেশ ব্যাংক। চিঠিতে বলা হয়- সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলকারী প্রার্থীদের ঋণখেলাপ সংক্রান্ত তথ্য প্রদানের লক্ষ্যে সব প্রার্থীর পূর্ণ নাম, পিতার নাম, মাতার নাম, স্বামীর নাম (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) বাংলা ও ইংরেজিতে পাঠানোর অনুরোধ করা হলো। একই সঙ্গে সব প্রার্থীর জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর (এনআইডি), করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন), জন্ম তারিখ, স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানার তথ্য পাঠাতে অনুরোধ করা হয়।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ। এ জন্য মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষদিন নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত। মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময়সীমা ছিল ৩০ ডিসেম্বর থেকে গতকাল ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত। রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করা যাবে আজ থেকে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত। আপিল নিষ্পত্তি ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত। প্রার্থিতা প্রত্যাহার করা যাবে ২০ জানুয়ারি। রিটার্নিং কর্মকর্তা চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে প্রতীক বরাদ্দ করবেন ২১ জানুয়ারি। প্রচারণা শুরু হবে ২২ জানুয়ারি। প্রচার চালানো যাবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com