

ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যার ঘটনায় ১৭ জনকে অভিযুক্ত করে গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করা হয়েছে। পল্লবী থানা যুবলীগের সভাপতি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পীর নির্দেশে হাদিকে খুন করা হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
গতকাল ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ এবং তার সহযোগীকে পালাতে সহায়তা করেছিলেন তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী। বিভিন্ন স্থান থেকে পাওয়া সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা এবং অস্ত্র ও গুলির ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে আসামিদের সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করা হয়েছে। অভিযুক্ত ফয়সাল করিমের ভিডিওবার্তারও ফরেনসিক যাচাই করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ওসমান হাদি হত্যা মামলায় আদালতে যে ১৭ জনকে অভিযুক্ত করে তদন্ত প্রতিবেদন (চার্জশিট) দাখিল করা হয়েছে, তার মধ্যে ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল, ফয়সালের বোন জেসমিন, আলমগীর ও ফিলিপসহ পাঁচজন এখনও পলাতক রয়েছে। অধিকতর তদন্তে আরও যদি কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়, তাহলে আদালতে সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করা হবে।
অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক ধারার সূচনা করেন হাদি। বিভিন্ন সময়ে তিনি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের বিগত দিনের কার্যকলাপ সম্পর্কে সমালোচনামূলক জোরালো বক্তব্য দিতেন। তার এ বক্তব্যে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়। ঘটনার দিন তাকে গুলি করা পলাতক আসামি ফয়সাল করিম নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ফয়সাল করিম ও তার সহযোগী আলমগীর হোসেনকে পালানোর বিষয়ে সার্বিক সহায়তা করেন আসামি তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী। বাপ্পী পল্লবী থানা যুবলীগের সভাপতি ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৬নং ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ মনোনীত নির্বাচিত কমিশনার (কাউন্সিলর) ছিলেন। আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং হাদির পূর্ববর্তী বিভিন্ন বক্তব্যের কারণে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
হাদি হত্যার পরিকল্পনা ও নির্দেশদাতার বিষয়ে শফিকুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তাইজুল ইসলাম বাপ্পীর নির্দেশে হত্যা করা হয় ওসমান হাদিকে। উদ্ধারকৃত অস্ত্র দিয়েই গুলি করা হয়েছে কিনা বিষয়টি নিশ্চিত হতে আমরা অস্ত্রের ফরেনসিক করেছিলাম। এই অস্ত্র ব্যবহার করেই তারা হাদিকে গুলি করে হত্যা করেছিল।
নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ভিডিওবার্তা দেওয়া ফয়সালের বিষয়ে শফিকুল ইসলাম বলেন, ফয়সালের ভিডিওবার্তা পর্যালোচনা করা হয়েছে এবং প্রাথমিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। ফয়সাল তিনটি ভিডিওবার্তা দিয়েছেন, সেগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হয়নি, এটি মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে ভিডিওবার্তাগুলো আসল। ফয়সাল দুবাইতে থাকার যে দাবি করছেন, সেই অবস্থান সঠিক নয়। তদন্তের তথ্যপ্রমাণ অনুযায়ী, ফয়সাল ভারতে অবস্থান করছেন। ভারতে আরও কয়েকজন আটক হওয়ার বিষয়টি ভারতীয় পুলিশ অস্বীকার করেছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের কাছে তথ্য আছে যে, তারা সেখানে গ্রেপ্তার হয়েছিল। তবে বর্তমানে তাদের বিষয়ে আমরা নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছি না।
সার্বিক তদন্ত ও সাক্ষ্যপ্রমাণে গ্রেপ্তার আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় রেকর্ড করা হয়। বিভিন্ন স্থান থেকে প্রাপ্ত ফুটেজ পর্যালোচনা, অস্ত্র ও গুলির ফরেনসিক রিপোর্ট, মোবাইল ও অন্যান্য ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষার রিপোর্ট অনুসারে আসামিদের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হওয়ায় ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এদের মধ্যে ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পলাতকরা হলেনÑ হাদিকে গুলি করা ফয়সাল করিম মাসুদ, মোটরসাইকেলচালক আলমগীর শেখ, তাদের পালাতে সহায়তা করা মানবপাচারকারী ফিলিপ স্নাল, হত্যার নির্দেশদাতা তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী ও ফয়সালের বোন জেসমিন। ভবিষ্যতে এ মামলায় কোনো তথ্যপ্রমাণ বা কারও সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে আদালতে সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করা হবে। এখন চার্জশিট দেওয়া হয়েছে।
ঝুট বাপ্পী থেকে কিলার : তাজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী একসময় এলাকায় ‘ঝুট বাপ্পী’ নামে পরিচিত ছিলেন। গার্মেন্টসশিল্পের ঝুট কাপড়ের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তার উত্থান। পরে চাঁদাবাজি, দখলদারি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেন। তার বিরুদ্ধে পরিবহন, গার্মেন্ট ঝুট কাপড়, ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা, ফুটপাত ও অস্থায়ী বাজার থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি বাপ্পীকে।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, নিজের বাবার হাত ধরেই বাপ্পীর অপরাধ জগতে পদার্পণ। বাপ্পীর বাবা নজরুল ইসলাম চৌধুরীও মিরপুর-পল্লবীতে ঝুট মন্টু হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ওয়ান-ইলেভেনের সেনা শাসনের সময় গড়ে ওঠা পিডিপির প্রার্থীর রাজনীতি করতেন মন্টু। পরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। তবে ২০০৯ সালের ২৬ মে মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের নান্নু মার্কেটের সামনে প্রতিপক্ষ জামিল গ্রুপের গুলিতে নিহত হন মন্টু। এরপর মাত্র ২৬ বছর বয়সেই অর্ধশত গার্মেন্টসের ঝুট কাপড়ের ব্যবসায় নিয়ন্ত্রণ নেন তিনি। ২০১২ সালের জুলাইয়ে ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হন বাপ্পী। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পল্লবী থানা যুবলীগের সভাপতির পদ পান তিনি। গত বছর জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর হামলা ও হত্যাকাণ্ডের একাধিক মামলার আসামি হন তিনি। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে দেশব্যাপী ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হলে বাপ্পীর নামও আলোচনায় আসে।
ওসমান হাদি ঢাকা-৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন। এ জন্য তিনি গণসংযোগ চালাচ্ছিলেন। গত ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের পর রাজধানীর বিজয়নগর কালভার্ট রোডে রিকশায় থাকা হাদিকে গুলি করে সন্ত্রাসীরা। তার মাথায় গুলি করার পর মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায় খুনিরা। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও এভারকেয়ার হাসপাতাল হয়ে হাদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে ১৮ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন মারা যান তিনি। সংসদ ভবনের সামনে অনুষ্ঠিত হাদির জানাজায় লাখো মানুষ উপস্থিত হন। হাদির খুনিদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করে আসছে ইনকিলাব মঞ্চ।