বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচন বরাবরই সংবেদনশীল বিষয়।


বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচন বরাবরই সংবেদনশীল বিষয়।
পেশিশক্তির দাপট রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করে। এতে সহনশীলতা, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার জায়গা সংকুচিত হয়ে যায়। বিরোধী মতকে দমন করাই রাজনৈতিক সাফল্যের প্রধান কৌশল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। তরুণসমাজ রাজনীতিকে একটি সহিংস ও অনৈতিক ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে শুরু করে। এতে রাজনীতিতে নতুন ও সৎ নেতৃত্ব তৈরির পথ সংকুচিত হয় এবং অপরাধপ্রবণতার বিস্তার ঘটে।
অর্থ ও পেশিশক্তিমুক্ত নির্বাচন ছাড়া প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র গড়ে ওঠে না। সংসদ বা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান তখন প্রকৃত অর্থে জনগণের প্রতিনিধি হয়ে উঠতে পারে না। আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণ সাধারণ মানুষের চাহিদা অনুযায়ী না হয়ে ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর স্বার্থে পরিচালিত হয়। এর ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আরো পিছিয়ে পড়ে এবং সামাজিক ন্যায়বিচার দুর্বল হয়ে যায়।
একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনব্যবস্থা রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে। যখন মানুষ বিশ্বাস করে যে তাদের ভোটের মূল্য আছে, তখন তারা রাষ্ট্রের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত মনে করে। নাগরিক দায়িত্ববোধ বাড়ে, আইন মানার প্রবণতা বৃদ্ধি পায় এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা আসে। বিপরীতে, প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ সৃষ্টি করে, যা দীর্ঘ মেয়াদে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ায়।
অর্থ ও পেশিশক্তিমুক্ত নির্বাচন নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কমিশনকে সাংবিধানিকভাবে স্বাধীন হওয়ার পাশাপাশি কার্যকর ও নিরপেক্ষ হতে হবে। নির্বাচনী ব্যয়ের সীমা কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং কালো টাকার ব্যবহার দমনে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে দলীয় প্রভাবমুক্ত থেকে ভোটার ও ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ছাড়া কোনো নির্বাচনই বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে না।
রাজনৈতিক দলগুলোর দায়ও এখানে কম নয়। প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে অর্থ ও বাহুবলের বদলে যোগ্যতা, সততা ও জনগ্রহণযোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দলীয় রাজনীতিতে গণতন্ত্রচর্চা না হলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। দলের ভেতরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে না পারলে নির্বাচন কখনোই অর্থ ও পেশিশক্তিমুক্ত হবে না।
নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের ভূমিকা এই প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনী অনিয়ম, সহিংসতা এবং অর্থের অপব্যবহার তুলে ধরতে গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ও সাহসী হতে হবে। নাগরিক সমাজকে ভোটারদের সচেতন করতে হবে, যাতে তাঁরা ভয় বা লোভের কাছে নিজেদের ভোট বিক্রি না করেন। সচেতন নাগরিক অংশগ্রহণ ছাড়া গণতন্ত্র টেকসই হতে পারে না।
অর্থ ও পেশিশক্তিমুক্ত নির্বাচন কেবল একটি নৈতিক দাবি নয়, এটি রাষ্ট্রের টিকে থাকার প্রশ্ন। উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তি হলো রাজনৈতিক বৈধতা। অবকাঠামো বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যতই হোক, জনগণের সম্মতি না থাকলে সেই উন্নয়ন টেকসই হয় না। শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে ওঠে শক্তিশালী গণতন্ত্রের ওপর ভর করে।
বাংলাদেশের ইতিহাস প্রমাণ করে, এ দেশের মানুষ ভোটাধিকার নিয়ে কখনোই আপস করেনি। গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম এই জাতির রাজনৈতিক চেতনার অংশ। সেই ঐতিহাসিক আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান জানাতে হলে নির্বাচনকে অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাব থেকে মুক্ত করতেই হবে। এটি কোনো দলীয় দাবি নয়, এটি রাষ্ট্র ও জাতির ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
শেষ পর্যন্ত সত্যটি সহজ। নির্বাচন যদি জনগণের না হয়, তবে রাষ্ট্রও জনগণের থাকে না। তাই একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং অর্থ ও পেশিশক্তিমুক্ত নির্বাচনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের সবচেয়ে জরুরি দাবি। এর মাধ্যমেই গণতন্ত্র নতুন করে প্রাণ পেতে পারে, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হতে পারে এবং জনগণ আবার বিশ্বাস করতে পারে যে তাদের ভোটই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
লেখক : প্রকাশক ও কলাম লেখক