

আইপিএল থেকে বাংলাদেশি পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেছেন আইসিসির সাবেক হেড অব কমিউনিকেশনস সামি-উল-হাসান বার্নি। সোমবার তিনি বলেন, ভারতীয় বোর্ড আরও কৌশলী হলে বর্তমানে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে ঘিরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা সহজেই এড়ানো যেত।
কলকাতা নাইট রাইডার্সের সঙ্গে চুক্তি থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে অব্যাহতি দেওয়ার ঘটনাই একের পর এক ঘটনার সূত্রপাত করে। এর জেরে ‘নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ’ দেখিয়ে বাংলাদেশ ভারতে খেলতে অস্বীকৃতি জানায় এবং ৭ ফেব্রুয়ারি শুরু হতে যাওয়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের পাশে সংহতি প্রকাশ করে পাকিস্তান সরকারও নির্দেশ দিয়েছে, ১৫ ফেব্রুয়ারি ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটি না খেলতে। সেই অনুযায়ী ম্যাচ বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান।
আইসিসিতে দীর্ঘদিন কাজ করার পর পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) মিডিয়া ডিরেক্টর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করা বার্নি বলেন, মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে প্রকাশ্যে ঘোষণা দেওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না বিসিসিআইয়ের।
পিটিআইকে তিনি বলেন, ‘ক্রিকেট প্রশাসকরা বা যারা খেলার দায়িত্বে আছেন, তারা যদি একটু বেশি সতর্ক হতেন এবং প্রকাশ্যে ঘোষণা না দিতেন-যে একজন বাংলাদেশি খেলোয়াড়কে (মোস্তাফিজ) ফ্র্যাঞ্চাইজি থেকে সরানো হচ্ছে-তাহলে এই পুরো পরিস্থিতিই এড়ানো যেত।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিসিসিআই চাইলে বিষয়টি গোপনেই কেকেআরকে জানাতে পারত। তখন কেউ জানতই না কী হয়েছে, আর জীবন স্বাভাবিকভাবেই এগিয়ে যেত। কিন্তু কখনো কখনো ভুল সিদ্ধান্তে দেওয়া একটি বক্তব্য বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। ৩ জানুয়ারির সেই ঘোষণাই ট্রিগার হয়ে দাঁড়ায়।’
বার্নি জানান, পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নাকভির দৃষ্টিভঙ্গিও তিনি ভালোভাবে বোঝেন। নাকভি একই সঙ্গে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।
বার্নির মতে, বাংলাদেশের ম্যাচের ভেন্যু ভারত থেকে শ্রীলংকায় সরাতে আইসিসির অস্বীকৃতিকে নাকভি ‘গোলপোস্ট সরিয়ে নেওয়া’ হিসেবে দেখছেন।
তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের নভেম্বরে আমি যখন পিসিবিতে ছিলাম, তখন আইসিসির একটি ই-মেইল আসে, যেখানে বলা হয় বিসিসিআই জানিয়েছে-ভারত সরকার পাকিস্তানে দল পাঠানোর অনুমতি দেয়নি। তখন নাকভি মনে করেছিলেন, একই নীতি যদি জানুয়ারিতে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হতো, তাহলে এই দ্বৈত মানদণ্ডের অভিযোগ উঠত না।’
বার্নির মতে, এই দ্বৈত মানদণ্ডের অনুভূতিই পিসিবি ও নাকভিকে সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ করেছে।
বাংলাদেশ-ভারত বিরোধ কি পাকিস্তানের লড়াই-এমন প্রশ্নে বার্নি বলেন, ‘আমরা একমত হতে পারি, দ্বিমতও পোষণ করতে পারি, তর্কও করতে পারি। কিন্তু যখন সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, তারা এমন বিষয় বিবেচনা করে, যা আমরা সাধারণ মানুষ হয়তো দেখতে পাই না।’
আইসিসি ইঙ্গিত দিয়েছে, ম্যাচ বর্জনের কারণে পিসিবিকে আর্থিক জরিমানা ও বড় অঙ্কের রাজস্ব ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে। তবে বার্নির বিশ্বাস, পাকিস্তান সরকার সব দিক বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ নয়। নিশ্চয়ই তারা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছেন, আইনি দিক দেখেছেন। একটি ম্যাচ না খেলায় প্রায় ২৫ কোটি মার্কিন ডলার ক্ষতি হতে পারে, যেখানে পাকিস্তানের বার্ষিক আয় মাত্র সাড়ে ৩ কোটি ডলার। পার্থক্যটা বিশাল।’
তবে বার্নি স্মরণ করিয়ে দেন, ভারত-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক সিরিজ না খেলেও গত দুই দশকে টিকে থেকেছে পাকিস্তান ক্রিকেট।
তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান ২০ বছর ধরে ভারতে কোনো দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলেনি। ২০০৯ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত তারা ঘরের মাঠে খেলতেই পারেনি, মধ্যপ্রাচ্য বা সংযুক্ত আরব আমিরাতে খেলেছে। তবুও তারা ২০০৯ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ও ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জিতেছে।’
শেষে বার্নি বলেন, ‘হ্যাঁ, আর্থিক ক্ষতি হবে। কিন্তু ২০ বছর ভারত ছাড়া টিকে থাকতে পারলে, পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড এবারও টিকে থাকতে পারবে।’