

দীর্ঘ ১৮ মাস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন শেষে এখন কিছুটা নিরিবিলি সময় কাটাচ্ছেন নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি সরকারের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর তিনি বর্তমানে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘যমুনায়’ অবস্থান করছেন। তবে খুব শিগগিরই তিনি তাঁর চিরচেনা কর্মস্থল ও নিজ বাসভবনে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
আইন অনুযায়ী ড. ইউনূসের আরও ৩ মাস যমুনায় বসবাসের সুযোগ থাকলেও, তিনি দ্রুত এটি ছেড়ে দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তার এই ইচ্ছার পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) গণপূর্ত বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল যমুনা পরিদর্শন করেছেন। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ড. ইউনূস সম্ভবত আগামী মাসখানেক বা ঈদের পর গুলশানের নিজ বাসভবনে ফিরে যাবেন।
ক্ষমতা থেকে বিদায় নিলেও জনকল্যাণমূলক কাজ থেকে দূরে থাকছেন না ড. ইউনূস। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা জানিয়েছেন, তিনি এখন তার বিখ্যাত ‘থ্রি জিরো’ (শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য নিট কার্বন নিঃসরণ) ধারণার ওপর ভিত্তি করে নতুন কিছু উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য নতুন কিছু করার কথা ভাবছেন তিনি। বর্তমানে তিনি ইউনূস সেন্টারে ফেরার প্রস্তুতি হিসেবে প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও সাংগঠনিক কাজ গুছিয়ে নিচ্ছেন।
রাষ্ট্রীয় ব্যস্ততা শেষে ড. ইউনূস এখন পরিবারের সদস্যদের বেশি সময় দিচ্ছেন। বিশেষ করে তার অসুস্থ স্ত্রীর পাশে তিনি দিনের বড় একটা অংশ ব্যয় করছেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বেশ সাধারণ রুটিন মেনে চলছেন। প্রতিদিন সকালে যমুনা কম্পাউন্ডের ভেতরেই হাঁটাহাঁটি করেন এবং সকাল ১০টার পর থেকে কাজ শুরু করেন। যারা তার সঙ্গে দেখা করতে চান, তাদের সুযোগ দেওয়ার জন্য তিনি কর্মকর্তাদের স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। আগে রাষ্ট্রীয় ব্যস্ততার কারণে অনেকের সঙ্গে দেখা করতে না পারলেও, এখন তিনি সবার কথা শুনতে চান।
সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূস এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি ক্ষমতা ছাড়ার এক সপ্তাহ আগেই তার কূটনৈতিক (লাল) পাসপোর্ট হস্তান্তর করেছেন। কেবল তিনি নন, তার মন্ত্রিসভার আরও প্রায় ২০ জন উপদেষ্টা ও সমমর্যাদার ব্যক্তিবর্গ ভোটের আগেই তাদের কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন বলে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
বেসরকারি জীবনে ফিরলেও আন্তর্জাতিক মহলে ড. ইউনূসের চাহিদা আগের মতোই তুঙ্গে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে তিনি সফরের আমন্ত্রণ পাচ্ছেন। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) সাবেক প্রধান সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ তার এই আন্তর্জাতিক যোগাযোগের বিষয়গুলো দেখভাল করছেন। আগামী মাসেই ৫ দিনের এক সফরে ড. ইউনূসের জাপানে যাওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া সশরীরে বা ভার্চুয়ালি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন তিনি।
পুরো দিন কাজের মধ্যে থাকলেও বিকেল ৫টার দিকে ড. ইউনূস পুনরায় হাঁটাহাঁটি করেন। সন্ধ্যাটা কাটে ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে। এছাড়া তার মেয়ের দুই পোষা বিড়াল ‘মিনু’ ও ‘কায়রো’র সঙ্গেও তাঁর বেশ আনন্দময় সময় কাটছে বলে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। প্রায় দেড় বছর দেশ পরিচালনার পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে দেশে আবারও নির্বাচিত শাসনব্যবস্থা ফিরে আসে।