

জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য মনোনয়নপ্রত্যাশী বিএনপির নারীনেত্রীরা এরই মধ্যে সরব হয়ে উঠেছেন। আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত না এলেও তারা দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিজেদের যোগ্যতা, রাজনৈতিক অবদান ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার প্রমাণ পাঠাতে শুরু করেছেন। কেউ কেউ আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা এবং দলের প্রতি আনুগত্যের বর্ণনা তুলে প্রোফাইল তৈরি করছেন, আবার কেউ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে দেখা করে মনোনয়ন নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন।
এবারের আলোচনায় রয়েছেন সাবেক এমপি, মহিলা দলের নেত্রী, ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী এবং সাবেক রাজনৈতিক পরিবার থেকে আসা নেত্রীদের মিশ্রণ। দলীয় সূত্র জানাচ্ছে, ঈদের আগে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার সম্ভাবনা কম। তবে বিভিন্ন পর্যায়ের নেত্রীদের মধ্যে উৎসাহ ও দৌড়ঝাঁপ তুঙ্গে, যা নারী আসনের জন্য বিএনপির রাজনৈতিক সম্ভাবনা ও অভিজ্ঞতার নতুন চিত্র উঠে আসছে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানান, সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের প্রক্রিয়া কার্যত শুরু হয়ে গেছে। সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো যাদের মনোনীত করবেন, মূলত তারাই নির্বাচিত হবেন। দলগুলো ইতোমধ্যে প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে। বিধি অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণের ৯০ দিনের মধ্যে এই নির্বাচন সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কমিশন সেই সময়ের মধ্যেই তা সম্পন্ন করবে।
দলের জন্য নিবেদিত, যোগ্য ও জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে এমন নেত্রীদের সংরক্ষিত আসনে প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত বিএনপিরÑ এমনটা জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘নারী আসনের নির্বাচন তো পার্লামেন্টের সিদ্ধান্তে হবে। প্রার্থী মনোনয়নের যোগ্যতা হবে দলের আদর্শ, নীতি ও জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকতে হবে। থাকতে হবে দলের জন্য ত্যাগও। এছাড়া নারী আসনে মনোনয়ন একই পরিবারের দুই সদস্য বিবেচনা করা হবে কিনা সে বিষয়ে এখনই কিছু বলা যাবে না। এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসনে জয় পায়। আসন অনুপাতে সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসনের মধ্যে দলটি পাবে ৩৫টি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ১১টি ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ১টি আসন পাবে। অন্য ৩টি আসন স্বতন্ত্র প্রার্থী ও নিজস্ব প্রতীকে জয়ী ছোট দলগুলোর মধ্যে বণ্টন করা হবে। বিধি অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণের ৯০ দিনের মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। প্রতি ছয়জন সাধারণ সদস্যের বিপরীতে একটি সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন হবে। কোনো কারণে বণ্টন করা আসনসংখ্যা মোট আসনের চেয়ে বেড়ে গেলে ভগ্নাংশের হিসাবে হেরফের হতে পারে। আইনে কোনো কোনো ক্ষেত্রে লটারির বিধানও রয়েছে।
বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার সংরক্ষিত নারী আসনগুলো হবে নবীন-প্রবীণের মিশ্রণে। তবে অপেক্ষাকৃত তরুণদের বড় একটা অংশকে দেখা যেতে পারে। আলোচনায় নাম শোনা যাচ্ছে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের স্ত্রী হাসিনা আহমেদ, স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বিদ্যুৎ, জ¦ালানি এবং খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর স্ত্রী রুমানা মাহমুদ, প্রয়াত ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের স্ত্রী হাসনা জসীমউদ্দিন মওদুদ, জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুন রায় চৌধুরী, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীর মেয়ে সামিরা তানজিনা চৌধুরী, প্রয়াত বিএনপি নেতা নাছির উদ্দিন পিন্টুর স্ত্রী নাসিমা আক্তার কল্পনা, সাবেক কাউন্সিলর সাইদুর রহমান নিউটনের সহধর্মিণী, বিএনপি নেতা নাছির উদ্দিন আহমেদ পিন্টুর বোন ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি, সিলেটের সাবেক সংসদ সদস্য ড. সৈয়দ মকবুল হোসেনের (লেচু মিয়া) মেয়ে সৈয়দা আদিবা হোসেন, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী বীথিকা বিনতে হোসাইন, চট্টগ্রামের বিএনপি নেতা সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে আইনজীবী ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা, ঢাকা-১৪ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনে লড়ে হেরে যাওয়া সানজিদা ইসলাম তুলি, বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস আকতার জাহান শিরিন, জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ, মহিলা দলের সহসভাপতি নাজমুন নাহার বেবী, যুগ্ম সম্পাদক হেলেন জেরিন খান, ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী ও বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শাম্মী আকতার, মাহমুদা হাবিবা, সাবেক এমপি নিলোফার চৌধুরী মনি, রাশেদা বেগম হীরা, রেহেনা আকতার রানু, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেত্রী ও সাবেক এমপি আসিফা আশরাফী পাপিয়া, মহিলা দল নেত্রী শাহানা আকতার সানু, নিয়াজ হালিমা আর্লি, রাবেয়া আলম, রুমা আক্তার, লাইলী বেগম, ঝালকাঠি জেলা বিএনপি নেত্রী জেবা আমিন খান, সাবেক এমপি ইয়াসমিন আরা হক, চেমন আরা বেগম, জাহান পান্না, বিলকিস ইসলাম, ফরিদা ইয়াসমিন, নির্বাহী কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট ড. আরিফা জেসমিন নাহিন, আয়শা সিদ্দিকা মানি, চিকিৎসক ডা. ইলমা মোস্তফা, বদরুন্নেসা সরকারি কলেজ ছাত্রদলের প্রথম ভিপি বেগম খায়রুন নাহার।
মহিলা দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক শাহিনুর নার্গিস, এলিজা শারমীন জুঁই, কুমিল্লা জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মাছুমা আক্তার, জাসাসের সাবেক সহসভাপতি ও চিত্রনায়িকা শাহরিয়ার ইসলাম শায়লা, ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেত্রী আরিফা সুলতানা রুমা, শওকত আরা উর্মি, সেলিনা সুলতানা নিশিতা, নাদিয়া পাঠান পাপন, শাহিনুর সাগর, আসমা আজিজ, সুলতানা জেসমিন (জুঁই), নাসিমা আক্তার (কেয়া)। এ ছাড়া কণ্ঠশিল্পী কনক চাঁপা, বেবী নাজনীন, রিজিয়া পারভীনের নামও শোনা যাচ্ছে।
ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসাধারণ সম্পাদক আরিফা সুলতানা রুমা আমাদের সময়কে বলেন, ১/১১ সরকারের সময় থেকে আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসছি। আন্দোলন করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়ে একটানা ৬ মাস কারাগারে ছিলাম। ৫টি মামলার আসামি হয়েছি। আমি আশা করি দলত্যাগীদের মূল্যায়ন করবে। যেহেতু আমি আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলাম, সে হিসেবে আমাকে মূল্যায়ন করবে বলে প্রত্যাশা করি এবং সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন পাব বলে আশা রাখি।
নিজের প্রত্যাশার কথা জানিয়ে প্রয়াত শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী বীথিকা বিনতে হোসাইন বলেন, ২০১৫ সাল থেকে আমার সংগঠনের ব্যানারে দেশের মানুষের জন্য এবং দলের গুম, খুনের শিকার যারা হয়েছেন তাদের আইনি সহযোগিতা দেওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য সহযোগিতাও করেছি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর দেশ গড়ার পরিকল্পনা নিয়ে তারুণ্যের রাষ্ট্র চিন্তার সংলাপগুলো শুরু করেছি।
জানতে চাইলে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ আমাদের সময়কে বলেন, দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। দলটির রাজনীতি রক্তের সঙ্গে মিশে আছে। প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে অবদান রেখেছি, প্রতিটি অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে সফল করেছি। ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া নাই; তবে রাজনীতিতে মূল্যায়ন চাই। দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে চাই। দল এখন সরকার গঠন করেছে, আমরাও চাই সরকারের কাজে অংশগ্রহণ করতে; সরকারকে সহযোগিতা করতে।
ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী নাদিয়া পাঠান পাপন আমাদের সময়কে বলেন, দলের জন্য কাজ করেছি; কোথাও পালিয়ে যাইনি। যেহেতু দলের আদর্শের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই তাই প্রত্যাশা করছি আমাকে মূল্যায়ন করা হবে।