

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত এবং ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর তিন দিনের সরকারি সফরে আজ ঢাকা আসছেন। নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় পাঁচ মাসের মাথায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এ সফরকে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য হবে পরিবর্তিত আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার, কৌশলগত অবস্থান এবং প্রধান শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের দিকনির্দেশনা সম্পর্কে ওয়াশিংটনের স্পষ্ট ধারণা নেওয়া।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সফরকালে সার্জিও গোর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করবেন। এ ছাড়া তিনি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করবেন এবং সেখানে মানবিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা নেবেন।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর বাংলাদেশ চীন, তুরস্ক, সৌদি আরব, রাশিয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ আরও জোরদার করেছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া ও চীন সফর, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফর এবং সৌদি আরব ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ ওয়াশিংটনের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র জানার চেষ্টা করবে নতুন সরকার ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে কোন কৌশলগত অবস্থানে দেখতে চায়।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশেষ দূতদের সফর সাধারণত নির্দিষ্ট কৌশলগত উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই হয়ে থাকে। সে বিবেচনায় সার্জিও গোরের সফরের অন্যতম লক্ষ্য হবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যৎ রূপরেখা, আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের অগ্রাধিকার সম্পর্কে সরাসরি আলোচনা করা।
গত মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে দুই দেশ মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন, তিস্তা প্রকল্প, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলাসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়। এসব উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে কূটনৈতিক মহল মনে করছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঢাকা ও ওয়াশিংটন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সফরে ডিজিটাল প্রযুক্তি খাত অন্যতম আলোচ্য বিষয় হবে। বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, বিশেষ করে ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রযুক্তি খাতে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন চাইছে না বাংলাদেশের ডিজিটাল অবকাঠামোতে চীনের প্রভাব আরও বিস্তৃত হোক।
এ প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত চুক্তির বাস্তবায়নও বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। চুক্তির ডিজিটাল বাণিজ্য ও প্রযুক্তি অধ্যায়ে বাংলাদেশ মার্কিন ডিজিটাল পণ্যের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক ডিজিটাল সার্ভিস ট্যাক্স আরোপ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, এমন কোনো তৃতীয় দেশের সঙ্গে ডিজিটাল বাণিজ্য চুক্তি করার আগে ওয়াশিংটনের সঙ্গে পরামর্শ করার বিষয়েও সম্মত হয়েছে। চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব না হলে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে চুক্তি বাতিল করে পুনরায় পারস্পরিক শুল্ক আরোপ করতে পারবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশ বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নীতি ও সংশ্লিষ্ট আইন প্রণয়নের কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে এই নীতিমালা এমনভাবে প্রণয়ন করা হোক, যাতে মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো সহজে বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসা পরিচালনা করতে পারে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সফরে শুধু ডিজিটাল খাত নয়, বাংলাদেশ-চীন, বাংলাদেশ-রাশিয়া ও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, ভারত-পাকিস্তান পরিস্থিতি, ইরান ইস্যু, রোহিঙ্গা সংকট, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়েও মতবিনিময় হবে। যুক্তরাষ্ট্র জানতে চাইবে, পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ কীভাবে নিজের কৌশলগত স্বার্থ মূল্যায়ন করছে এবং ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নে কী ধরনের অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বাণিজ্য চুক্তি এখনও কার্যকর রয়েছে এবং বাংলাদেশ শর্তগুলো মেনে চলতে আইনগতভাবে বাধ্য। তিনি বলেন, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে সার্জিও গরের দায়িত্বের অংশ হিসেবেই তিনি এ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ সফর করছেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো উচ্চপর্যায়ের সফর দুই দেশের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এবারের সফরে বাণিজ্য, অর্থনৈতিক কূটনীতি, জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ যখন একদিকে চীন, রাশিয়া, তুরস্কসহ বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণ করছে এবং অন্যদিকে স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির কথা বলছে, তখন সার্জিও গরের এই সফর দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ কৌশলগত সম্পর্কের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এদিকে মার্কিন দূতের আসন্ন বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে সরকার কোনো ধরনের চাপ অনুভব করছে না বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। একই সঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি জাতীয় স্বার্থভিত্তিক। কোনো একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন মানেই অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি নয়। তিনি বলেন, একজনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষতি করে আরেকজনের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি করছি, আমরা কখনও সেটা করব না। এটা তো স্ত্রী ও সতিনের মধ্যে মারামারি নয়। এটা হচ্ছে স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্কÑ যেখানে আমাদের স্বার্থ, আমরা সেখানে যাব। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ কূটনীতিতে আন্দাজের ভিত্তিতে নয়, বাস্তবতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়।