শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ১১:৩৯ পূর্বাহ্ন

যে জন্মদিন অশ্রুসিক্ত স্মৃতিরঞ্জন

সাঈদ খান
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ২ বার
ক্যালেন্ডারের পাতায় আজ ১৫ আগস্ট। দিনটি যেন জন্মদিনের স্মৃতি আর চিরবিদায়ের বেদনা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।

কিন্তু এই দিনটি আর আগের বছরের মতো নয়। কারণ এই প্রথম কোনো জন্মদিনে তিনি নেই, নেই কোনো আনুষ্ঠানিকতা, নেই কেক কাটার আনন্দ, নেই ফুলের বন্যা। আছে শুধু স্মৃতি, আছে গভীর ভালোবাসা, আছে অশ্রুসিক্ত নীরবতা। তাঁর পুত্র প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আজ মা-হারানোর অপার কষ্ট, যে বেদনা তিনি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের মাঝেও একাকী বয়ে চলেছেন।
জনগণের সেবার মাধ্যমেই খুঁজে চলেছেন তাঁর মায়ের আদর্শের প্রতিফলন। সঙ্গে বাবা হারানোর বেদনা তো রয়েছেই—১৯৮১ সালের ৩০ মে যখন শহীদ হন জিয়াউর রহমান, তারেক রহমান তখন মাত্র ১৬ বছরের কিশোর।
প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পতাকায়, প্রতিটি নিপীড়িত মানুষের হৃদয়ে তিনি আজও বিদ্যমান। যিনি স্বৈরাচারের দুর্গ কাঁপিয়েছেন, যিনি কারাগারের স্যাঁতসেঁতে প্রকোষ্ঠকেও সংগ্রামের প্রেক্ষাগৃহে পরিণত করেছেন, যিনি সন্তান হারিয়েও কখনো নীতি থেকে বিচ্যুত হননি, তাঁরই এই জন্মদিন আজ এক জাতির মনঃকষ্টের প্রতীক।

যে জন্মদিন অশ্রুসিক্ত স্মৃতিরঞ্জনবাংলার ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব কাহিনি। এক সাধারণ গৃহবধূর অসাধারণ রাজনৈতিক উত্থানের মহাকাব্য। ১৯৪৫ সালের এই দিনে দিনাজপুরের মাটিতে যখন ‘পুতুল’ নামের সেই কন্যাসন্তানটির আবির্ভাব ঘটেছিল, তখন কে জানত এই শিশুটিই একদিন বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়াবে? কে জানত তিনি একদিন স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লৌহমানবী হয়ে উঠবেন? কে জানত তিনিই হবেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান? সময় যেন তাঁকে ডেকে এনেছিল ইতিহাসের এক অমোঘ প্রয়োজনে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় যখন পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে গ্রেপ্তার করে সেনানিবাসে বন্দি করে রেখেছিল, তখনো তিনি দুই পুত্রকে বুকে জড়িয়ে রেখেছিলেন। আর আজ সেই দুই সন্তানের একজন চিরবিদায় নিয়েছেন ২০১৫ সালে।

আর বড় ছেলে তারেক রহমান হয়েছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। মায়ের রোগশয্যার পাশে সব সময় তিনি ছিলেন না—এই বেদনা আজ তাঁর প্রাণে বিষের মতো লাগে। তিনি জানেন, মা কখনো তাঁকে ছেড়ে যেতে চাননি, কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম মেনে নিতেই হয়েছে।
১৯৮১ সালের ৩০ মে দেশি-বিদেশি চক্রান্তে চট্টগ্রামের সেনানিবাসে সেনা সদস্যদের গুলিতে শহীদ হন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। মাত্র ২১ বছরের দাম্পত্যজীবনের অবসান ঘটে, খালেদা জিয়া অকালবৈধব্য বরণ করেন। স্বামীর মৃত্যুর পর বিএনপি নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে। দলের ভেতরে শুরু হয় কোন্দল, ছেঁড়াছিঁড়ি। নেতাকর্মীরা তখন ভাবতে শুরু করেন, এই দলকে টিকিয়ে রাখার মতো একজন নেতার প্রয়োজন, আর সেই মানুষটি হলেন খালেদা জিয়া।

১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বাংলার রাজনীতির ইতিহাসে এক যুগান্তকারী দিন। খালেদা জিয়া বিএনপির প্রাথমিক সদস্য পদ গ্রহণ করলেন। সাধারণ গৃহবধূ থেকে তিনি হয়ে উঠলেন রাজনীতির নবীন যোদ্ধা। সেই দিনও কেউ জানত না, এই নারীই একদিন স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন, গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণের অগ্রদূত হবেন। তিনি কিন্তু কোনো অনুগ্রহে শীর্ষ পদ পাননি। তিনি ধাপে ধাপে দলীয় নিময়-নীতি ও শৃঙ্খলা মেনে সামনে এগিয়েছেন। ১৯৮৩ সালের মার্চে ভাইস চেয়ারপারসন, পরে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন এবং অবশেষে ১৯৮৪ সালের ১০ মে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। এর পর থেকে তাঁর ৪৩ বছরের রাজনৈতিকজীবনের ৪১ বছরই তিনি দলের শীর্ষ নেতা হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এটি একটি বিরল ও ঐতিহাসিক রেকর্ড।

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উত্খাত করে ক্ষমতা দখল করেন। তিনি জারি করেন কালো আইন ‘এমএলআর ৮২’, যার মাধ্যমে গ্রেপ্তার হতে থাকেন হাজার হাজার রাজনৈতিক নেতাকর্মী। খালেদা জিয়া প্রথম থেকেই এই অবৈধ ক্ষমতা দখলের তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, স্বৈরাচার মেনে নিলে গণতন্ত্র আর ফিরবে না।

এরশাদের শিক্ষামন্ত্রী ড. মজিদ খান ১৯৮২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর একটি নতুন শিক্ষানীতি প্রস্তাব করেন। প্রথম শ্রেণি থেকে আরবি ও দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে ইংরেজি বাধ্যতামূলক করা হয়। এটি ছিল ধর্মীয় ও সাম্রাজ্যবাদী প্রভাব বিস্তারের এক অপচেষ্টা। এই শিক্ষানীতির প্রতিবাদে ১৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষা দিবসে ছাত্রসমাজ প্রথম মিছিল করে। ছাত্রদলের ব্যানারে লেখা ছিল—‘এরশাদের পতন চাই’। এই একটি স্লোগানই হয়ে ওঠে আগামী আট বছরের আন্দোলনের মূলমন্ত্র। ৭ নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবসে খালেদা জিয়া ছাত্রদলকে শপথ পড়ান। ১১-১২ ডিসেম্বর ছাত্রদলের বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সর্বসম্মতিক্রমে খালেদা জিয়াকে বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়।

১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ইতিহাসে এটি একটি রক্তাক্ত ও শোকাবহ অধ্যায়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে হাজার হাজার শিক্ষার্থী শান্তিপূর্ণ মিছিল নিয়ে সচিবালয়ের দিকে এগিয়ে যান। কিন্তু মিছিলটি হাইকোর্ট এলাকায় পৌঁছলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। সেই দিন শহীদ হন জাফর, জয়নাল, দীপালি, আইয়ুব, ফারুক, কাঞ্চনসহ প্রায় ১০ জন। আহত শত শত, গ্রেপ্তার এক হাজার ৩৩১ জন, শুধু সরকারি হিসাবেই। ১৪ ফেব্রুয়ারিই ছিল মূলত এরশাদকে উত্খাতের সূচনাপর্ব। পরদিন ১৫ ফেব্রুয়ারি আবারও গুলি চলে, শহীদ হন আরো ১৫ জন।

ছাত্ররা যখন পলাতক, নেতারা কারাবন্দি, তখনো খালেদা জিয়া থেমে যাননি। তিনি শহীদ মিনারে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে তাঁর নেতৃত্বে মৌন মিছিল শহীদ মিনারে পৌঁছে। সেদিন তিনি প্রমাণ করেছিলেন—নেতা শুধু দলের অফিসে বসে নির্দেশ দেন না, তাঁরা মিছিলের পুরোভাগে হাঁটেন, বুলেটের মুখে দাঁড়ান, কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠকে আন্দোলনের প্রসঙ্গতায় পরিণত করেন।

২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাদদেশ থেকে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১০ দফা ঘোষণা করে। এই ১০ দফার ৩৫টি উপধারা ছিল, যার প্রথম তিনটি ছিল শিক্ষাসংশ্লিষ্ট, বাকি সাতটি ছিল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আন্তর্জাতিক দাবি। এই ১০ দফার স্লোগান মন্ত্রের মতো উচ্চারিত হতো স্বৈরাচারবিরোধী প্রতিটি মিছিলে।

১৯৮৩ সালের ৪ ও ৫ সেপ্টেম্বর সাত দলীয় ও ১৫ দলীয় জোটের বৈঠকে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে পাঁচ দফা প্রণীত হয়। দফাগুলো ছিল—সামরিক শাসন প্রত্যাহার, সংবিধান পুনরুদ্ধার, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্দলীয় নির্বাচন ও রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি। ১৯৮৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনারের জনসভায় খালেদা জিয়া ঘোষণা দেন—‘পাঁচ দফার কোনো আপস হবে না।’ এই ঘোষণার মাধ্যমেই তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে আখ্যায়িত হন।

১৯৮৬ সালের ১৮ মার্চ চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠে শেখ হাসিনা নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘যারা এরশাদের অধীনে নির্বাচনে যাবে, তারা জাতীয় বেঈমান।’ কিন্তু মাত্র তিন দিন পর ২১ মার্চ রাত ১টা ৪০ মিনিটে শেখ হাসিনা তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দেন। এই সিদ্ধান্তে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে চিড় ধরে এবং ১৫ দল ভেঙে আট দল ও পাঁচ দল হয়। খালেদা জিয়া তখনো অটল, তিনি তাঁর সাত দল নিয়ে নির্বাচন বর্জন করেন। কারণ তিনি জানতেন, এরশাদের অধীনে কোনো নির্বাচনই গণতান্ত্রিক হতে পারে না।

১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর জেহাদের লাশ সামনে রেখে ২৪টি ছাত্রসংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত হয় ‘সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য’। ১০ নভেম্বর রাজপথে শহীদ হন নূর হোসেন। ২১ নভেম্বর তিন জোট এক হয়ে গঠন করে ‘তিন জোটের রূপরেখা’, যার মূলকথা ছিল নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন। ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচারী এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। গণতন্ত্রের বিজয়ের মিছিলে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ছাত্র-জনতা রাজপথে নামে। ইতি ঘটে স্বৈরাচার এরশাদের।

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয় বহু প্রতীক্ষিত সংসদীয় নির্বাচন। বিএনপি ১৪০টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। খালেদা জিয়া পাঁচটি আসনে নির্বাচন করে সব কটিতে জয়ী হন। এটি ছিল জনগণের তাঁর প্রতি আস্থার চূড়ান্ত প্রমাণ। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান হিসেবে শপথ নেন।

খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের নারী জাগরণের অগ্রদূত। তাঁর নেতৃত্বে নারী উন্নয়ন আইনি কাঠামোর বাইরে গিয়ে বাস্তবিক উন্নয়নে রূপ নেয়। নারীশিক্ষা, কর্মসংস্থান, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়, যা নারীদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলে।

তিনি ‘বিনা মূল্যে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন’ প্রণয়ন করেন এবং মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনা বেতনে পড়াশোনার ব্যবস্থা করেন। ছাত্রীদের জন্য ‘শিক্ষা উপবৃত্তি’ এবং ‘শিক্ষার জন্য খাদ্য’ কর্মসূচি চালু করেন। তাঁর সরকার সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ২৭ থেকে বাড়িয়ে ৩০ বছর করে এবং শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেয়। তাঁর আমলে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পথচলা শুরু হয় এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেওয়া হয়।

১৯৯৫ সালে তিনি ‘বেগম রোকেয়া পদক’ প্রবর্তন করেন, যা নারীর ক্ষমতায়নে অসামান্য অবদান রাখা ব্যক্তিদের সম্মাননা প্রদান করে। মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ এবং নারী ও শিশু পাচার রোধে কঠোর আইন প্রণয়ন করেন। তাঁর সময়েই স্কুলগুলোতে ছাত্র-ছাত্রীর অনুপাত ১৯৯১ সালে ৫৫ঃ৪৫ থেকে ১৯৯৬ সালে ৫২ঃ৪৮-এ উন্নীত হয় এবং প্রাথমিক শিক্ষায় মেয়েশিশুদের তালিকাভুক্তি প্রায় ৩০ লাখ বেড়ে যায়।

নারীর ক্ষমতায়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন বৃদ্ধি, নতুন ক্যাডেট কলেজ ও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন করেন। ২০০১ সালে তিনি পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ‘এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন’ প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে ১৬টি দেশের ৫০১ জন ছাত্রী লেখাপড়া করেছেন, বেশির ভাগই বিনা খরচে। ২০০৪ সালে ফোর্বস সাময়িকী তাঁকে বিশ্বের ১০০ ক্ষমতাবান নারী নেত্রীর মধ্যে ১৪তম স্থান দেয়।

২০০৬ সালে তিনি ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ২০০৭ সালের ‘ওয়ান-ইলেভেন’—এক কালো অধ্যায়। তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়, মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়, এক বছর সাত দিন কারাবন্দি রাখা হয়। ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর সেনানিবাসের বাড়ি থেকে তাঁকে উচ্ছেদ করা হয়। সেদিন তিনি অশ্রুসজল কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আমাকে অপমান করা হয়েছে, কিন্তু আমি মাথা নত করব না।’ ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতির মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। পুরনো কারাগারের স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে বিনা চিকিৎসায় বন্দি থাকতে থাকতে তাঁর শরীর ভেঙে পড়ে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বিদেশে উন্নত চিকিৎসার সুপারিশ করলেও সরকার বারবার তা নাকচ করে দেয়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলে পরদিন ৬ আগস্ট খালেদা জিয়া সম্পূর্ণ মুক্তি পান। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে লন্ডনে তাঁর চিকিৎসা হয়, কিন্তু নানা রকম রোগের জটিলতা তাঁকে দুর্বল করে তোলে। ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর তাঁকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ৩০ ডিসেম্বর সকাল ৬টায় তিনি চিরবিদায় নেন।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সাড়া ফেলে। বিবিসি, আলজাজিরা, রয়টার্স, দ্য ডন, এনডিটিভি—সব কটিই খবরটিকে প্রধান শিরোনামে স্থান দেয়। বিএনপি সাত দিনব্যাপী শোক পালনের ঘোষণা দেয়। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক এবং এক দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেন।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দর্শন ছিল—মা, মাটি, মানুষ, গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা। তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘গণতন্ত্র’ ছাড়া কোনো জাতির মুক্তি নেই। তিনি বলতেন, ‘অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা যায় না। কারণ মাথা নত করলে আর কখনো সোজা করা যায় না।’ তিনি নেতাকর্মীদের কথা শুনতেন, বারবার শুনতেন, আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতেন—আর একবার সিদ্ধান্ত নিলে তাতে অটল থাকতেন।

এই জন্মদিনে তিনি আমাদের চোখের সামনে নেই, কিন্তু রয়েছেন আমাদের হৃদয়ে, আমাদের চেতনায়, আমাদের প্রতিটি গণতান্ত্রিক স্বপ্নে।

লেখক : যুগ্ম সম্পাদক, কালের কণ্ঠ

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com