

আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন লিওনেল মেসি। তার বিদায়কে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্রীড়া সংবাদমাধ্যম আর্জেন্টিনা জাতীয় দল ও বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসের এক অসাধারণ অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবে দেখছে।
হঠাৎ করে নেওয়া এই সিদ্ধান্তের সময় নিয়ে বিস্ময় থেকে শুরু করে মেসির পরিসংখ্যান ও শিরোপার হিসাব—সবই উঠে এসেছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে। দুই দশকেরও বেশি সময় আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে খেলার পর তার বিদায়ে জাতীয় দলে যে বিশাল শূন্যতা তৈরি হবে, সেটিও বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।
৩৯ বছর বয়সী মেসি আবেগঘন এক বার্তায় অবসরের খবর জানান। তিনি বলেন, সিদ্ধান্তটি ‘তাকে কষ্ট দিয়েছে এবং এখনও দিচ্ছে’। তবে তার মনে হয়েছে, এবার সময় এসেছে সরে দাঁড়ানোর। তিনি আরও জানান, আর্জেন্টিনার হয়ে দেওয়ার মতো তাঁর আর কিছু অবশিষ্ট নেই এবং নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের সুযোগ পাওয়ার সময় এসেছে।
মেসিকে ছাড়া নতুন যুগের শুরু
আর্জেন্টিনার সংবাদপত্র ওলে ২০২৬ সালের ৩১ আগস্টকে একটি ঐতিহাসিক দিন হিসেবে উল্লেখ করেছে। পত্রিকাটির মতে, দিনটি আর্জেন্টিনার স্মৃতিতে চিরকাল লেখা থাকবে। এই দিনেই মেসি ‘অতুলনীয় এক উত্তরাধিকার’ পাকাপোক্ত করেছেন।
মেসির ‘আমি আমার সবটুকু দিয়েছি’ কথাটিও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। পত্রিকাটি এটিকে আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের সারসংক্ষেপ হিসেবে দেখেছে, নিছক বিদায়ের কোনো শীতল ঘোষণা হিসেবে নয়।
হাতে লেখা বার্তাটির ব্যক্তিগত আবেগও আলাদা করে তুলে ধরেছে পত্রিকাটি। মেসি জানিয়েছেন, তিনি জাতীয় দলকে ভালোবেসেছেন এবং সবসময় ভালোবাসবেন। এখন মাঠের খেলোয়াড়ের ভূমিকা ছেড়ে বাইরে থেকে দলের সমর্থক হিসেবে পাশে থাকবেন—সাফল্যের সময় যেমন, কঠিন সময়েও তেমন।
এরপরই মেসিকে ছাড়া আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তার বিদায়ে তাৎক্ষণিক পরিকল্পনায় কী ধরনের পরিবর্তন আসবে এবং কোচ লিওনেল স্কালোনি কেমন দল নিয়ে নতুন অধ্যায় শুরু করবেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মেসির অবসর শুধু একজন খেলোয়াড়ের গল্পের সমাপ্তি নয়, বরং আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জন্য নতুন একটি যুগের সূচনা।
বিশ্ব ফুটবলে বড় ধাক্কা
স্পেনের সংবাদপত্র মার্কা মেসির অবসরকে ‘বিশ্বজুড়ে বড় বিস্ফোরণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের মতে, এর মাধ্যমে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে মেসির ২১ বছরের ক্যারিয়ারের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটল—যে অধ্যায় ভরা ছিল শিরোপা ও রেকর্ডে।
মেসির বিদায়ের পর জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। কোচ স্কালোনির ভবিষ্যৎ থেকে শুরু করে দলের নতুন নেতৃত্ব—সবকিছু নিয়েই এখন ভাবতে হবে আর্জেন্টিনাকে।
মেসির আন্তর্জাতিক রেকর্ডকে এমন এক মানদণ্ড হিসেবে উল্লেখ করেছে মার্কা, যা ছোঁয়া অত্যন্ত কঠিন। আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল করে তিনিই দেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা এবং সর্বোচ্চ গোল করা খেলোয়াড়।
কাতালোনিয়ার সংবাদমাধ্যম মুন্দো দেপোর্তিভো মেসিকে বলেছে ‘সেরা’। তাদের ভাষায়, ‘ফুটবলবিশ্বে বড় ধাক্কা। ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি, যাকে অনেকেই ফুটবল ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় মনে করেন, আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে খেলা থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন।’
শিরোপার অভিশাপ ভাঙার পরও বিদায়টা বেদনাদায়ক
ইতালির গাজেত্তা দেল্লো স্পোর্ত মেসির অবসরের মানবিক দিকটি তুলে ধরেছে। তাদের শিরোনামে সিদ্ধান্তটিকে বলা হয়েছে ‘বেদনাদায়ক, কিন্তু প্রয়োজনীয়’।
পত্রিকাটি মেসির বক্তব্য তুলে ধরে লিখেছে, ‘দেওয়ার মতো আমার আর কিছুই নেই। আর কিছু অসাধারণ তরুণ খেলোয়াড় আসছে, যারা এই দলে থাকার সুযোগ পাওয়ার যোগ্য।’
মেসির বিদায়ের সঙ্গে জাতীয় দলের হয়ে তার দীর্ঘ যুগের সমাপ্তির বিষয়টি তুলে ধরেছে সংবাদমাধ্যমটি। আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এবং দুইবারের কোপা আমেরিকা জয়ী হিসেবে রেখে বিদায় নিচ্ছেন তিনি।
ফ্রান্সের ক্রীড়া সংবাদপত্র লেকিপ মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ব্যাপ্তির ওপর জোর দিয়েছে। ৩৯ বছর বয়সে দুই দশকেরও বেশি সময় জাতীয় দলের হয়ে খেলার পর অবসর নিয়েছেন তিনি। তাঁর নিজের কথাও তুলে ধরা হয়েছে—সিদ্ধান্তটি এখনও তাঁর ভেতরে কষ্ট দেয়, কিন্তু তিনি মনে করেন সময় এসে গেছে।
ফ্রান্সের ফুটবলভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ফুট মেরকাতোর মতে, মেসির অবসরের মধ্য দিয়ে ‘আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি’ ঘটেছে।
সংবাদমাধ্যমটি আরও লিখেছে, ‘ফাইনালে একের পর এক তিক্ত পরাজয়ের পর অবশেষে ২০২১ সালে মেসি সেই অভিশাপ ভাঙেন। সেখান থেকেই শুরু হয় সোনালি যুগ। যার চূড়ান্ত সাফল্য আসে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে।’
ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস তাদের প্রতিবেদনে লিখেছে, ‘মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর: ফুটবল হারাল তার আত্মার একটি অংশ।’
তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বকাপের শিরোপা ধরে রাখতে না পারা এবং বাবা হোর্হে মেসির মৃত্যুর পর আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে মেসি তার ক্যারিয়ারের ইতি টেনেছেন।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে আর্জেন্টিনার জার্সিকে আলোকিত করা মেসির বিদায়ে তাই শুধু একটি জাতীয় দলের একজন খেলোয়াড়ই বিদায় নিলেন না; বিশ্ব ফুটবলের একটি স্বর্ণালি অধ্যায়েরও পর্দা নামল।