

বরিশাল সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে চাকরির পাশাপাশি কোটি টাকার মাদ্রাসা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন আরবির প্রভাষক মুহাম্মদ মুস্তফা কামাল। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকরির পাশাপাশি তিনি গোপনে একটি মাদ্রাসা পরিচালনা করছেন। সেখানে চলে নানা বাণিজ্য ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা।
সূত্র জানায়, মুস্তফা কামাল ‘আল জামি’আহ আস-সালাফিয়্যাহ’ নামের মাদ্রাসার পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ সরকারি নীতিমালায় কোনো শিক্ষক একই সময়ে দুটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার সুযোগ নেই। বিষয়টি নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের অজানা থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে অনেকেরই জানা। মুস্তফা কামাল নিয়মিত মাদ্রাসায় সময় দিচ্ছেন। তবে কলেজে তার উপস্থিতি অনিয়মিত।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি কর্মঘণ্টায়ও তিনি নিজ প্রতিষ্ঠানের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, যা সরাসরি সরকারি চাকরির বিধির লঙ্ঘন। মুস্তফা কামালের সঙ্গে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আবু মামুনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে জানা গেছে।
একাধিক সূত্র জানায়, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের আশীর্বাদেই দীর্ঘদিন তিনি মাদ্রাসা পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছেন। আবু মামুনের সিন্ডিকেটের বিশেষ সদস্য হিসাবে পরিচিতি থাকায় কেউ মুস্তফা কামালের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।
বরিশাল সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আবু মামুন বলেন, আইন অনুসারে কোনো সরকারি স্কুলের শিক্ষক আলাদা কোনো প্রতিষ্ঠান চালাতে পারবে না। যদি তিনি এমন কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকেন, অবশ্যই তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জানা যায়, মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হিসাবে রয়েছেন মুস্তফা কামালের স্ত্রী। এতে মাদ্রাসায় তৈরি হয়েছে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ ও অস্বচ্ছতা। প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ, আর্থিক লেনদেন, এমনকি ভর্তি কার্যক্রমেও একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ এই দম্পতির হাতে। অভিযোগ রয়েছে, মাদ্রাসার প্রতিটি রুমে এসি লাগানোসহ বিলাসবহুল পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, যা স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। প্রশ্ন উঠেছে, একজন কলেজ শিক্ষকের পক্ষে কীভাবে এত ব্যয় বহন করা সম্ভব? এছাড়াও মাদ্রাসার সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে ‘অলাভজনক প্রতিষ্ঠান’। কিন্তু বাস্তবে এটি রমরমা বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছাড়া কিছুই নয়।
মাদ্রাসায় প্রি-প্লে থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের কাছ থেকে মাসিক ফি বাবদ আয় হচ্ছে প্রায় ১০ লাখ টাকা। এর বাইরে রয়েছে বই-খাতা-পেনসিল থেকে শুরু করে সব শিক্ষা উপকরণই মাদ্রাসা থেকে কিনতে বাধ্য করার অভিযোগ। সেখান থেকেও প্রতিমাসে বাড়তি আয় করছে কর্তৃপক্ষ।
অভিভাবকরা জানান, শিক্ষার্থীদের দেওয়া বই-খাতা কলম এমনকি পেনসিল পর্যন্ত মাদ্রাসা থেকেই চড়া দামে কিনতে হয়। একজন অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার বাচ্চার এক মাসের খরচ প্রায় ৩ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে। তাহলে এটা কেমন অলাভজনক প্রতিষ্ঠান? বাইরের দোকান থেকে বই-খাতা কেনার সুযোগ নেই। বললেই বলা হয়, আমাদের বই আলাদা। বাইরের বই মানসম্মত নয়। এ বিষয়ে মুস্তফা কামালের মোবাইল ফোনে কল দিয়ে জানতে চাইলে তিনি সংযোগ কেটে দেন।
স্থানীয় শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, মাদ্রাসাটির কোনো অনুমোদন নেই। এমনকি শিক্ষা বোর্ড বা মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের নিবন্ধনও নেই। আরও জানা যায়, মাদ্রাসা দাখিল স্তরের অনুমোদন না থাকলেও অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে ভর্তির বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষা অফিসার মাসুদুর রহমান বলেন, সরকারি চাকরির বিধি লঙ্ঘন করে একজন শিক্ষকের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চালানো আইনবিরোধী। খোঁজখবর নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।