

অবশেষে দীর্ঘ ১৮ বছরের বেশি সময় ধরে নির্বাসিত জীবন শেষে দেশের মাটিতে পা রাখতে চলেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আগামী ২৫ ডিসেম্বর সকালে তিনি ঢাকা পৌঁছাবেন বলে জানিয়েছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এর মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের দীর্ঘ নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটছে; জনতার মঞ্চে এক কাতারে শামিল হওয়ার প্রহর গুনছেন তিনি। তারেক রহমানের দেশে আগমন ঘিরে লন্ডন-ঢাকা রুটের বিমান টিকিটগুলো এরই মধ্যে প্রায় শেষ হয়ে গেছে বলে জানা গেছে।
এদিকে দলের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতার আগমনের সময় ঘোষণার পর থেকেই বিএনপির রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে, যা দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নতুন মেরূকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাকে স্বাগত জানাতে ও বরণ করতে নানামুখী প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। দলটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংবর্ধনার আয়োজন করবে বলে জানা গেছে। এরই মধ্যে তারেক রহমানের কার্যালয়ের (গুলশান ও নয়াপল্টন) প্রয়োজনীয় সাজসজ্জা সম্পন্ন হয়েছে। তবে তারেক রহমানের ফেরা নিয়ে বিএনপি এখন পর্যন্ত কোনো কর্মসূচি চূড়ান্ত করেনি।
তারেক রহমানের দেশে ফেরা স্বস্তির বার্তা: বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে শুক্রবার রাত পৌনে ১০টায় এক জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডাকেন। এর আগে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, আগামী ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমান দেশের মাটিতে পা রাখছেন। এ সময় মির্জা ফখরুল বলেন, ‘গণতন্ত্রে উত্তরণের পথে যেসব বাধা সৃষ্টি হয়েছিল, তারেক রহমান দেশে এসে পৌঁছালে সেসব বাধা দূর হয়ে যাবে।’ তিনি উল্লেখ করেন, ‘দেশের ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, যেখানে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করা একজন নেতা তার জনগণের মাঝে ফিরে আসছেন।’ তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনে দেশবাসী এবং গণতন্ত্রকামী মানুষের মধ্যে নতুন করে আশা ও বিশ্বাসের সঞ্চার হবে বলে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন মির্জা ফখরুল।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, তারেক রহমান ও তাদের একমাত্র সন্তান ব্যারিস্টার জেইমা রহমান ২৫ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার সকালে লন্ডন থেকে সরাসরি ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবেন। তার সফরসঙ্গী হিসেবে পরিবারের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সদস্য থাকার কথা রয়েছে। বিমানবন্দর থেকে তিনি সরাসরি রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে যাবেন। যেখানে তার মা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া চিকিৎসাধীন আছেন। এরপর তারেক রহমান পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খালেদা জিয়ার বাসভবন ‘ফিরোজা’য় সময় কাটাবেন। দলীয়প্রধান হিসেবে তিনি নীতিনির্ধারক ও সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মসূচি নির্ধারণ করবেন।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী গতকাল কালবেলাকে বলেন, ‘বিএনপির মতো বৃহৎ ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৮ বছর পর তিনি দেশে ফিরবেন এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আনন্দের খবর। তার আগমন সময় নির্ধারণ হওয়ার খবরে বিএনপির প্রতিটি নেতাকর্মী উল্লসিত ও উচ্ছ্বসিত। কেননা, তিনি শুধু বিএনপির নন দেশের আপামর জনসাধারণের নেতা। জনগণ তাকে বরণ করতে তৈরি। আর দেশে ফেরার মাধ্যমে তারেক রহমানের দীর্ঘ দেড়যুগের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটবে।’
তারেক রহমানকে বরণ করতে নানা প্রস্তুতি: গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর থেকেই তারেক রহমানের দেশে ফেরার বিষয়টি আলোচনায় আসে। তার মা খালেদা জিয়া গত মাসের শেষ দিকে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তারেক রহমানের দেশে ফেরা কবে—সে আলোচনা আবারও জোরদার হয়। এ ক্ষেত্রে আলোচনায় ঘুরেফিরে তারেক রহমানের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়টিও সামনে আসে। যদিও তার নিরাপত্তার বিষয়ে এরই মধ্যে বিএনপির দলীয় ও সরকারি পর্যায় থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ ও প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সরকারের দিক থেকে তারেক রহমানের ‘সর্বোচ্চ নিরাপত্তা’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ১৮ বছর পর দলের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতার প্রত্যাবর্তন ঘিরে তার নিরাপত্তা, বাসভবন সংস্কার, অফিস সজ্জাসহ যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। ইতোমধ্যে তারেক রহমানের জন্য কেনা কাস্টমাইজড বুলেটপ্রুফ গাড়ি দেশে এসে পৌঁছেছে এবং গাড়ির নিবন্ধনসহ প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন হয়েছে। দলীয় সূত্রের দাবি, দেশে ফিরলে তারেক রহমান ঢাকার গুলশান ২-এর বাড়িতে উঠবেন। সেটি প্রস্তুত করা হয়েছে। তিনি গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে নিয়মিত বসবেন। নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়েও তার জন্য একটি আলাদা কক্ষ প্রস্তুত করা হয়েছে।
ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সংবর্ধনার লক্ষ্য: দীর্ঘদিন ধরে নেতাকে কাছে না পাওয়ার আক্ষেপ মেটাতে বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো তারেক রহমানকে বরণ করে নিতে ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু করেছে। দলের লক্ষ্য হলো—এ সংবর্ধনাকে বাংলাদেশের ইতিহাসে রাজনৈতিক নেতার সবচেয়ে বড় জনসমাবেশে পরিণত করা। বিএনপি নেতাকর্মীরা আশা করছেন, তাদের দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দেশে ফেরার দিন বিমানবন্দরে এবং বিমানবন্দর থেকে খালেদা জিয়ার বাসভবন ‘ফিরোজা’ পর্যন্ত রাস্তার দুপাশে লাখ লাখ নেতাকর্মী ও সমর্থকের উপস্থিতি থাকবে। এরই মধ্যে রাজধানী ঢাকা এবং এর পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে বরণ প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা সভা চলছে। নেতাকর্মীরা তোরণ নির্মাণ, ফ্যাস্টুন, ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড দিয়ে রাস্তার গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো সজ্জিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন। দলের পক্ষ থেকে বিমানবন্দরে আগমনকালে যে কোনো বিশৃঙ্খলা এড়াতে স্বেচ্ছাসেবক টিম গঠন করা হচ্ছে, যারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে।
তারেক রহমানের দেশে ফেরা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান গতকাল কালবেলাকে বলেন, ‘বিমানবন্দর থেকে সরাসরি ফিরোজা কিংবা এভারকেয়ার হাসাপাতাল পর্যন্ত সড়কের দুপাশেই মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি থাকবে। কারণ তারেক রহমান বিজয়ের মাস ও স্বাধীনতার মাসেই বীরের বেশে দেশে ফিরছেন। এ নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আপনারা অপেক্ষা করুন, দেখবেন ২৫ ডিসেম্বরের আগেই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ ঢাকায় আসবেন।’
দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে বরণ করতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি। এ বিষয়ে মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু কালবেলাকে বলেন, ‘আমরা আমাদের নেতাকে স্বাগত জানাতে ও বরণ করতে প্রস্তুত। দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ যখনই কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন, আমরা তা পালন করব ইনশাআল্লাহ।’
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, তারেক রহমানের আগমন দেশের নির্বাচনমুখী রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। পাশাপাশি দীর্ঘদিন পর শীর্ষ নেতার সরাসরি উপস্থিতিতে দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা দূর হবে এবং নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুনভাবে উদ্দীপনা ঘটবে। তারেক রহমান দেশে ফিরে আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে চূড়ান্ত সাংগঠনিক ও নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ করবেন। সেইসঙ্গে জাতীয় ঐক্য জোরদার করার এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামকে বেগবান করার ডাক দিতে পারেন। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও জনসম্পৃক্ততা ভবিষ্যতে নতুন রাজনৈতিক জোট গঠনে সহায়ক ভূমিকা নিতে পারে। এমনকি তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসে একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
যেভাবে নির্বাসনে তারেক রহমান: ২০০১ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাজনীতিতে তারেক রহমানের সক্রিয় আগমন ঘটে। দেশে বিশৃঙ্খল অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি নিয়মতান্ত্রিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অপসারণ করে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। পরদিন ১২ জানুয়ারি উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের পর সরকারের পক্ষ থেকে দেশের শীর্ষ রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা করা হয়। ২০০৭ সালের ৭ মার্চ একটি দুর্নীতির মামলার আসামি হিসেবে তারেক রহমানকে তার ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের মইনুল রোডের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেসময় তার বিরুদ্ধে আরও ১৩টি দুর্নীতির মামলা করা হয় ও তাকে বিচারের সম্মুখীন করা হয়। তবে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে বিএনপির দাবি। শুধু তাই নয়, বিচার বিভাগীয় ব্যবস্থার আড়ালে তাকে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল।
আরও জানা যায়, গ্রেপ্তারের কিছুদিন পর তারেক রহমানকে আদালতে হাজির করা হলে তার ওপর শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ তোলেন তার আইনজীবীরা। আদালতের নির্দেশে চিকিৎসকদের একটি দল পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর আদালতকে জানায়, তারেক রহমানের ওপর শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ যুক্তিযুক্ত। একপর্যায়ে আদালত রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ শিথিল করেন এবং তারেক রহমানকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের পরিবর্তে বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ২০০৭ সালে ২৫ আগস্ট তারেক রহমান হাসপাতালে পা পিছলে পড়ে আহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ দেখা দেয়।
একপর্যায়ে ২০০৮ সালের আগস্টে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মামলাগুলো আদালতে গতি পায়। ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সব মামলায় তারেক রহমানের জামিন হয় ও বিএমইউ থেকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মুক্তি লাভ করেন। এরপর ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর রাতেই তিনি উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে যান। সেই থেকে সপরিবারে যুক্তরাজ্যেই অবস্থান করেন তারেক রহমান। এরমধ্যে ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তিনি সংগঠনের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হলে ওই দিনই কারাবন্দি হন। এরপর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে চরম প্রতিকূল পরিবেশে মূল নেতৃত্বে আসেন তারেক রহমান। সুদূর লন্ডনে থেকেই দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও শীর্ষ নেতাদের পরামর্শক্রমে দল পরিচালনা করেন তিনি। দীর্ঘ এই সময়ে নির্বাসনে থেকেই বিএনপিকে সুসংগঠিত করছেন তারেক রহমান। মূল দায়িত্বে এসেই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও মানুষের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেন। ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম এবং বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে দল এবং দেশকে তিনি এখন গণতন্ত্রে উত্তরণের একেবারে দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছেন বলে মনে করেন বিএনপির নীতিনির্ধারক ও বিশ্লেষকরা।