

গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দেশে দিন দিন প্রাণহানি বাড়ছে। প্রায় দিনই কোথাও না কোথাও সিলিন্ডার বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনা ঘটছে। বাসাবাড়ি, গাড়ি, এমনকি ট্রলারেও ঘটছে বিস্ফোরণ। তথ্য-উপাত্ত বলছে, সিএনজি, এলপিজি, অক্সিজেন, অ্যামোনিয়া, নাইট্রোজেন, হিলিয়ামসহ বিভিন্ন গ্যাসের মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডারের কারণেই বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটছে। এসব দুর্ঘটনার কারণ ও রোধ করার বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিস্ফোরণ ঠেকাতে অবশ্যই সিলিন্ডার ব্যবহারকারীকে সচেতন হতে হবে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর উচিত হবে বাজারে সরবরাহের আগে অবশ্যই সিলিন্ডারগুলো পরীক্ষা করা। নিয়মের মধ্যে থেকে সিলিন্ডার ব্যবহার ও সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা আরও বাড়বে।
সর্বশেষ গত শনিবার কক্সবাজারের কুতুবদিয়ায় সাগরে মাছ ধরার একটি ট্রলারে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়। এতে দগ্ধ হন ১২ জেলে। তাদের মধ্যে ৯ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আহত জেলেরা বলেছেন, সিলিন্ডারের আগুন ট্রলারে থাকা তেলের ড্রামের সংস্পর্শে এলে মুহূর্তেই তা ছড়িয়ে পড়ে। আগুন থেকে বাঁচতে অনেকেই সাগরে ঝাঁপ দেন।
এর আগে গত ৮ মার্চ নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণে মৃত্যু হয় চারজনের। ১১ মার্চ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে কুমিল্লার গৌরীপুরে বাসের সিএনজি সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে দুজনের প্রাণ যায়। গত ২২ জানুয়ারি
কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে বেলুনের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে নিহত হন তিনজন। ১১ জানুয়ারি বরগুনার পাথরঘাটায় একটি বরফকলে অ্যামোনিয়া গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে একজনের মৃত্যু হয়। আহত হয় শতাধিক মানুষ। সম্প্রতি রাজধানীর মগবাজারে গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
বিস্ফোরক পরিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনায় গত দুই বছরে প্রায় ৩০০ মানুষের প্রাণ গেছে। এর আগে ২০১৯ সালে ৮০টি দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় প্রায় ১০০ জনের।
বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ আমাদের সময়কে বলেন, ‘যেখানে সেখানে এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার বিক্রি বড় সমস্যা তৈরি করছে। এ খুচরা বিক্রেতাদের অধিকাংশই সঠিকভাবে সিলিন্ডার সংরক্ষণ করেন না। এটি বন্ধ করা জরুরি। মুদি দোকানের মতো যেখানে সেখানে বিক্রি করা সিলিন্ডারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বিক্রেতারা বুঝতে পারেন না। কিন্তু ওই সিলিন্ডারটি পরে বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।’
জ¦ালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বাসাবাড়িতে অনেকে সঠিক পদ্ধতিতে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করতে পারেন না। লিকেজ হলে অনেকেই বুঝতে পারেন না। এ কারণে অনেক বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। বেসরকারি কোম্পানিগুলো বিক্রয়পরবর্তী সেবা নিশ্চিত করলে এ ধরনের দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব।’
সর্বশেষ ট্রলারে বিস্ফোরণের ঘটনা সম্পর্কে চট্টগ্রামের প্রধান বিস্ফোরক কর্মকর্তা তোফজ্জল হোসেন বলেন, ‘জেলেরা ট্রলারে রান্না করছিলেন। সেখান থেকে তেলের ড্রামে আগুন লেগে যায়। এর পর বিস্ফোরণ ঘটে। তবে পুরোটা জানতে হলে আহত জেলেদের আগে সুস্থ হতে হবে এবং বিষয়টি তদন্ত করতে হবে।’
রূপাস্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির (আরপিজিসিএল) এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, বাজারে নিম্নমানের ও পুরনো সিলিন্ডার খুব একটা নেই। তবে খুচরা পর্যায়ে সিলিন্ডারের বডি কিংবা মুখে ক্ষতি হচ্ছে। এটি বিপজ্জনক। ফলে সিলিন্ডারের মেয়াদ কমে যাচ্ছে।
সরকারি কোম্পানিসহ বর্তমানে দেশে এলপিজি আমদানি, মজুদ ও বিতরণে ২৯টি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন রয়েছে। ৩৮ লাখ গ্রাহকের জন্য ৩ হাজার পরিবেশক ও ৩৮ হাজার খুচরা বিক্রেতা রয়েছেন। বার্ষিক এলপিজি ব্যবহারের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ টন। এর ৯৮ শতাংশ আসে বেসরকারি খাত থেকে। এলপি গ্যাসের চাহিদা ২০২৫ সালের মধ্যে ১ দশমিক ৮ মিলিয়ন টন এবং ২০৩০ সালে ২ দশমিক ৫ মিলিয়ন টনে উন্নীত হতে পারে। সূত্রে জানা যায়, সারাদেশে মেয়াদোত্তীর্ণ কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ সিএনজি সিলিন্ডার নিয়ে প্রায় দেড় লাখ যানবাহন চলাচল করছে। প্রতি পাঁচ বছর পর পর গাড়িতে বসানো সিলিন্ডার পরীক্ষা করে বিস্ফোরক অধিদপ্তরে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু তা মানা হচ্ছে না। মাত্র ১০-১৫ হাজার গাড়ি নিয়মিত এ প্রতিবেদন জমা দেয়। অন্যদিকে লোকবলের অভাবে বিষয়টি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে পারছে না বিস্ফোরক পরিদপ্তর।
বিস্ফোরক পরিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, নিয়ম মেনে রক্ষণাবেক্ষণ হলে বাসাবাড়িতে প্রতিটি সিলিন্ডার ৪০ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু দেশে সিলিন্ডারগুলো পরিবহন পর্যায়ে বিশেষ করে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই এগুলোর স্বাভাবিক জীবনকাল কমে যায়।