সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৯ অপরাহ্ন

এলএনজি টার্মিনালের বিকল্প কুয়াকাটা

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৪ বার

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল নির্মাণ করতে চায় সরকার। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্প ঘিরে ইতিমধ্যে মতভেদ তৈরি হয়েছে। একপক্ষ মনে করছে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে পাইপলাইন নির্মাণ পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি করবে। অন্যদিকে লাইটারেজ জাহাজে করে এলএনজি পরিবহনে ব্যয় বাড়বে। এর মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এলএনজি টার্মিনালের বিকল্প স্থান হিসেবে আলোচনায় এসেছে কুয়াকাটা।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি খুলনা এবং বাগেরহাট পরিদর্শন করেছেন। একই সঙ্গে সুন্দরবনের কাছে টার্মিনাল নির্মাণের জন্য জ¦ালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সঙ্গে দেখা করেছেন ইন্দোনেশিয়ার একটি কোম্পানির প্রতিনিধিরা।

জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানায়, সম্প্রতি জ্বালানি বিভাগে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন নিয়ে একটি বৈঠক করেছে। ওই বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার কোম্পানি জায়া সামুদ্রা কারুনিয়ার (জেএসকে) একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া হিরণ পয়েন্টে একটি এলএনজি এবং এলপিজি টার্মিনাল করার পৃথক প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়।

এর মধ্যে জেএসকে গভীর সমুদ্রে ভাসমান গ্যাস সংরক্ষণ ইউনিট (এফএসইউ) স্থাপন করবে। এ ছাড়া খুলনায় রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশে নিউজপ্রিন্ট মিলের ঘাটে ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) স্থাপন করতে চায়। এই পদ্ধতিতে হিরণ পয়েন্টের নিচে গভীর সমুদ্রে ইন্দোনেশিয়ার কোম্পানিটি এফএসইউ স্থাপন করবে। সেখান থেকে ছোট জাহাজে করে খুলনায় এলএনজি আনা হবে। সেই গ্যাস দিয়ে খুলনার রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো হবে। তাও আবার পূর্ণ ৯ পার্টে লোডে চলবে কেন্দ্রটি। জেএসকের তরফ থেকে বলা হয়েছে রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্র ৭০ শতাংশ লোডে চালানোর মতো গ্যাস সরবরাহ করতে পারবে তারা।

জেএসকের প্রস্তাবের সমস্যা কোথায় : জ্বালানি বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, জেএসকের প্রস্তাবের প্রধান সমস্যা হচ্ছে এর দাম। এই কাজে তিনটি লাইটারেজসহ জেএসকের ৫টি জাহাজ প্রয়োজন। একটি জাহাজ গভীর সমুদ্রে থাকবে। অন্যটি নিউজপ্রিন্ট মিল ঘাটে। বাকি তিনটি জাহাজ গভীর সমুদ্রের ভাসমান টার্মিনাল থেকে এলএনজি পরিবহন করবে। এলএনজি গভীর সমুদ্রে আনার জন্য জাহাজ ভাড়ার সঙ্গে তখন যোগ হবে লাইটারেজের খরচ। সব মিলিয়ে এলএনজি খুলনা পর্যন্ত আনা আর পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করার জন্য প্রতি এমএমবিটিইউর জন্য তারা ৪ ডলার দর প্রস্তাব করেছে। যেখানে মহেশখালীর দুটি এলএনজি টার্মিনালের একটি প্রতি এমএমবিটিইউর জন্য যথাক্রমে ৪৯ এবং ৪৮ সেন্ট নিয়ে থাকে। অর্থাৎ এই দাম প্রতি এমএমবিটিইউতে সাড়ে তিন ডলার বেশি।

অন্যদিকে খুলনা এবং ভেড়ামারা মিলিয়ে চারটি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। যার সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার ৬৪০ মেগাওয়াট। খুলনার দুটি কেন্দ্র চাহিদার সময় ডিজেল দিয়েও চালানো হয়। সেখানে একটি কেন্দ্রে আংশিক গ্যাস পাওয়া গেলেও অন্য কেন্দ্রগুলোর জন্য কোনো গ্যাস দিতে পারবে না জেএসকে। কোম্পানিটি বলছে তাদের সঙ্গে চুক্তি হওয়ার দুই বছর পর তারা গ্যাস সরবরাহ করতে পারবে। কারণ হিসেবে জানিয়েছে, এই পদ্ধতির এলএনজি পরিবহনের জন্য ৫টি জাহাজ তৈরি করতে তাদের এই সময় প্রয়োজন হবে।

হিরণ পয়েন্টে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে বাধা কোথায় : সূত্র জানায়, খুলনার আড়ংঘাটা সিটি গ্যাস স্টেশন (সিজিএস) থেকে দুবলার চরের দূরত্ব ১৩০ থেকে ১৪০ কিলোমিটার। এই ১৪০ কিলোমিটারের মধ্যে অন্তত ৮০ কিলোমিটার পাইপলাইন সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে নির্মাণ করতে হবে। দেশের গ্যাস আইন অনুযায়ী ২৪ থেকে ৩৬ ইঞ্চি গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ করতে ১৫ মিটার রাইট অব ওয়ে (আরওডব্লিউ) প্রয়োজন। অর্থাৎ সুন্দরবনের মধ্যে যে এলাকা পাইপলাইন স্থাপনের জন্য নির্ধারণ করা হবে সেখানে ৪৫ ফুট প্রস্থের একটি জমি প্রয়োজন হবে। যদিও ৩৬ ইঞ্চি পাইপলাইনের জন্য নির্মাণ পর্যায়ে ২৩ মিটার বা ৬৯ ফুট জমির প্রয়োজন হয়। সেই হিসাবে ১৬৮.২৫ হেক্টর বা ৪১৫.৬ একর জমির সব গাছ কেটে ফেলতে হবে। সুন্দরবনের মধ্যে এই ৮০ কিলোমিটারের পুরোটা ঘন বনে আচ্ছাদিত।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পাইপলাইনটি যদি সুন্দরবনের ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য এলাকার ভেতর দিয়ে যায়, অথবা বাইরে দিয়ে গেলেও সুন্দরবনের পরিবেশ ও বিশ্ব ঐতিহ্যের মূল্যকে প্রভাবিত করার আশঙ্কা থাকে, তাহলে ইউনেস্কোর কাছে প্রকল্পের তথ্য ও পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা পাঠানোর বাধ্যবাধকতা প্রযোজ্য হতে পারে। এর বাইরে দেশের বন এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়েরও অনুমোদন প্রয়োজন হবে। জ্বালানি বিভাগের এই প্রস্তাব শুরুতেই হোঁচট খেতে পারে।

এর আগে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য এলাকা থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে নির্মাণ করতে গিয়ে গত সরকারকে সময় বেগ পেতে হয়েছে। পরিবেশবাদী এবং জাতিসংঘকে বুঝিয়ে প্রকল্প শুরু করতে অন্তত তিন বছর সময় লেগে যায়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় একটি স্থায়ী এলপিজি টার্মিনাল নির্মাণের জন্য চট্টগ্রামের সংরক্ষিত বনের পাশে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জমি অধিগ্রহণ করে। তবে সরকারের বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের আপত্তিতে ওই প্রকল্পও ঝুলে যায়।

সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের চাপে এ ধরনের প্রকল্প নির্মাণ করা হলেও সরকার পরিবর্তনের পর যে দায় তৈরি হয় তা নিতে চান না তারা।

অন্যদিকে হিরণ পয়েন্টে ড্রাফট রয়েছে সাড়ে ৮ থেকে সাড়ে ১০ মিটার। এই ড্রাফটে এলএনজির বড় জাহাজ আনা সম্ভব নয়। সরকার যদি মনে করে তারা সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে পাইপলাইন নির্মাণ করে হিরণ পয়েন্টে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করবে তাহলেও অন্তত ৬০ কিলোমিটার সাবসি পাইপলাইন (সাগরের তলদেশ দিয়ে) নির্মাণ করতে হবে।

অন্যদিকে ২০১৭ সালের সামিট এলএনজি নেভিগেশন স্টাডি বলছে, ২ লাখ ১৬ হাজার ঘনমিটার ধারণক্ষমতার একটি এলএনজি ক্যারিয়ারের পূর্ণ বোঝাই অবস্থায় ড্রাফট থাকে ১২ দশমিক ২ মিটার। ওই জাহাজ চলাচলের জন্য ১৩ ও ১৫ মিটারের গভীরতা থাকা জরুরি।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই ড্রাফট পেতে আরও ৬০ কিলোমিটার সমুদ্রের গভীরে যেতে হবে।

অর্থাৎ মোট পাইপলাইন নির্মাণ করতে হবে ১৯০ থেকে ২০০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৬০ কিলোমিটার সাবসির ৮০ কিলোমিটার সুন্দরবনের মধ্যে দিয়ে নির্মাণ করতে হবে।

কুয়াকাটা বিকল্প কেন : কুয়াকাটায় এলএনজি জাহাজ আনতে হলেও সেখানেও ৬০ কিলোমিটার সাবসি পাইপলাইন নির্মাণ করতে হবে। এ ছাড়া কুয়াকাটা থেকে খুলনার সিটি গ্যাস স্টেশনের দূরত্ব ১৭০ কিলোমিটার। অর্থাৎ এখানে মোট পাইপলাইন নির্মাণ করতে হবে ২৩০ কিলোমিটার। তবে এর সব চেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে পাইপলাইনটি নির্মাণের পথে কোনো সংরক্ষিত বনাঞ্চল নেই। খুলনা থেকে কুয়াকাটার পুরোটাই সড়কপথে যাতায়াত সম্ভব। এখন খুলনা-কুয়াকাটা রুটের সব নদীর ওপরই ব্রিজ রয়েছে। এসব ব্রিজে গ্যাস পাইপলাইনের ভারবহন করার ক্ষমতা না থাকলেও সেটি করা খুব কঠিন কাজ নয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। অন্যদিকে এই পাইপলাইনের সব চেয়ে বড় সুবিধা হতে পারে ভোলা-বরিশাল পাইপলাইনের সংযুক্তি। ভবিষ্যতে ভোলা গ্যাস ক্ষেত্রকে এই পাইপলাইনে যোগ করা হলে খুলনার সঙ্গে বরিশালের অর্থনীতির বিকাশ সম্ভব। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাসের ব্যবহার বৃদ্ধি করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দুই পাইপলাইনের ব্যয়ের তফাত : কুয়াকাটা অথবা হিরণ পয়েন্ট দুই জায়গা এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করতে হলে ৬০ কিলোমিটার করে সাবসি পাইপলাইন নির্মাণ করতে হবে। প্রতি কিলোমিটার সাবসি পাইপলাইন নির্মাণ করতে ২ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়। কুয়াকাটা অথবা হিরণ পয়েন্ট দুই স্থানে সাবসি পাইপলাইনের জন্য ব্যয় দাঁড়াবে ১২০ মিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে হিরণ পয়েন্টে থেকে ১৪০ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণে আনুমানিক ব্যয় হবে ১৪০ মিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে কুয়াকাটা থেকে খুলনা পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণে খরচ হবে ১৭০ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ কুয়াকাটা থেকে খুলনায় গ্যাস আনতে ৩০ মিলিয়ন ডলার বেশি খরচ হবে। এই ৩০ মিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত খরচ হলেও বরিশাল বিভাগকে গ্যাস গ্রিডের আওতায় আনা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনের বৃক্ষ নিধন করতে হবে না। অন্যদিকে কুয়াকাটা থেকে খুলনা পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগ রয়েছে। এই সড়কের পাশ দিয়ে রাইট অব ওয়ের (আরওডব্লিউ) স্থান পাওয়া খুব কঠিন কাজ হবে না।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য : জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, সুন্দরবন আমাদের প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে। এ জন্য সুন্দরবনকে বাঁচাতে হবে। সুন্দরবনে প্রাণীর জন্য অভয়ারণ্য নিশ্চিত করতে হবে। অভয়ারণ্য বিপর্যন্ত হয় এমন কোনো কিছুই সেখানে করা যাবে না। সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে অর্থনৈতিক কর্মকা- বন্ধ রাখা উচিত। কিন্তু রামপাল নির্মাণের জন্য ১০ কিলোমিটারে নামিয়ে আনা হয়। এখন বোঝা যাচ্ছ কাজটি ভালো হয়নি। ফলে সুন্দরবনের পাশে আবারও সুন্দরবন বিধ্বংসী কোনো কিছু করা যাবে না।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পেট্রোলিয়াম ও খনিজসম্পদ প্রকৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, কুয়াকাটা করা হোক বা হিরণ পয়েন্ট করা হোক পাইপলাইনের ক্ষেত্রে খরচের তেমন হেরফের হবে না। এখানে মাথায় রাখতে হবে সুন্দরবনের যেন কিছু না হয়। তিনি বলেন, কুয়াকাটায় পাইপলাইন নির্মাণ করা হলে বরিশাল বিভাগেও গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব। সামান্য কিছু বাড়তি ব্যয় করে যদি নতুন একটি বিভাগকে আমরা জাতীয় গ্যাস গ্রিডের আওতায় আনতে পারি, তাহলে তাই করা উচিত।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com