

আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে ক্ষমতার সমীকরণ কিংবা কূটনীতির মারপ্যাঁচ কোনো স্থির জলাশয় নয়; এটি এক গতিশীল নদী, যা সময় ও জাতীয় স্বার্থের স্রোতে তার গতিপথ পরিমার্জন ও পরিবর্তন করে। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতির মর্যাদার মূল মানদণ্ড নির্ধারিত হয় সেই দেশ বিশ্ব দরবারে কার সামনে কতটা নত হলো, তা দিয়ে নয়, বরং নিজের স্বতন্ত্র সত্তা, জাতীয় স্বার্থ এবং জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছাকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে কতটা মাথা উঁচু করে তুলে ধরতে পারল- তার ওপর। ২০০৯ সাল থেকে পরবর্তী দীর্ঘ সময়জুড়ে বাংলাদেশ যে নতজানু ও দাসত্বভিত্তিক কূটনীতির শৃঙ্খলে বন্দি ছিল, চব্বিশের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তার অবসান ঘটেছে। ৫ আগস্টের বিপ্লব-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশের কূটনৈতিক আঙিনায় আজ যে সুবাসিত সৌরভ ছড়িয়ে পড়েছে, তা ৫৫ হাজার বর্গমাইলের এই ভূখণ্ডকে এক নতুন আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান করেছে। এই পরিবর্তনের মূলে রয়েছে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা ও জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক এক দৃঢ় পররাষ্ট্রনীতি, যা দীর্ঘদিনের আধিপত্যবাদী শেকল ভেঙে দেশকে এক বীরোচিত ও মর্যাদাপূর্ণ উচ্চতায় আসীন করেছে। বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক রূপান্তর কোনো হঠকারী বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এর পেছনে রয়েছে এক গভীর ঐতিহাসিক ও আদর্শিক উত্তরাধিকার। স্বাধীনতার ঘোষক, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে আত্মমর্যাদাশীল পররাষ্ট্রনীতির গোড়াপত্তন করেছিলেন, তা-ই ছিল বাংলাদেশের সার্বভৌম কূটনীতির মূল ভিত্তিপ্রস্তর। তিনি পরিষ্কারভাবে শিখিয়েছিলেন যে, বিশ্বের যে কোনো দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব হতে পারে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের জায়গায় বিন্দুমাত্র আপস করা যাবে না। পরবর্তীতে গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সেই নীতিকে আরও সংহত ও বাস্তবমুখী করেন। আঞ্চলিক রক্তচক্ষু ও চাণক্যনীতির হুমকিকে উপেক্ষা করে তিনি সর্বদা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের চাওয়া-পাওয়াকে সবার উপরে স্থান দিয়েছেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের এই কূটনৈতিক দর্শনের মূল সুরই ছিল—স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং জনস্বার্থকে রক্ষা করা; কোনো প্রতিবেশী কিংবা দূরবর্তী পরাশক্তির অহেতুক দাসত্ব করা নয়। আজ সেই মহান পিতা-মাতার যোগ্য উত্তরসূরি, দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই পিতা ও মাতার পদদর্শিত সেই সার্বভৌম কূটনৈতিক পথকেই পুনরুজ্জীবিত করেছেন। পতিত ও পলাতক স্বৈরাচারের রেখে যাওয়া দাসত্বের শৃঙ্খল ছিন্ন করে তারেক রহমান এক বীরোচিত জাতির কপালে পরাচ্ছেন গৌরবের দিনবদলের তিলক। তাঁর বিচক্ষণ ও দূরদর্শী বৈদেশিক নীতির ফলে বাংলাদেশ আজ কোনো নির্দিষ্ট দেশের করুণা বা প্রভাব বলয়ে আটকে থাকার পথ থেকে বেরিয়ে এসেছে। তিনি বাংলাদেশকে একটি আত্মনির্ভরশীল, সার্বভৌম এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমমর্যাদার বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে একের পর এক সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। রাজধানীতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬’ -এর সমাপনী দিনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের বক্তব্য এবং ভারতের আন্তর্জাতিকখ্যাত সংবাদপত্র *দ্য হিন্দু*-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারটি কেবল কূটনৈতিক পরিমণ্ডলের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং তা নতুন বাংলাদেশের স্বাবলম্বী ও আত্মবিশ্বাসী কূটনৈতিক মনস্তত্ত্বের এক যুগান্তকারী দলিল। সেখানে তিনি ভারতের আধিপত্যবাদী নীতিনির্ধারকদের পরিষ্কার বার্তা দিয়ে বলেছেন যে, বাংলাদেশের নবনির্বাচিত সরকারের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক চ্যালেঞ্জগুলো দিল্লিকে গভীরভাবে বুঝতে হবে। বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতিতে ‘স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি’ বা ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’-কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বিশ্বরাজনীতিতে ভারত যেমন নিজের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখে, বাংলাদেশও ঠিক একইভাবে নিজের প্রয়োজন ও জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে তার স্বাধীন সার্বভৌম পথ নির্ধারণ করবে। এখানে আমি দ্বিধাহীন চিত্তে বলতে পারি যে,পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যে ঐতিহাসিক প্রশ্নটি উত্থাপন করেছেন, তা আজ দেশের কোটি স্বাধীনচেতা মানুষের ভেতরের কণ্ঠস্বর। তিনি ভারতকে লক্ষ্য করে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন যে, প্রায় দুই হাজার নিরীহ নাগরিককে হত্যা করে এবং হাজার হাজার মানুষকে গুমের সাগরে ভাসিয়ে পলাতক হওয়া সন্ত্রাসী শেখ হাসিনা ও তাঁর নির্বাসিত সহযোগীরা যেভাবে ভারতে বসে বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চক্রান্ত করছে—ঠিক একই ধরনের পরিস্থিতি যদি ভারতের সঙ্গে হতো এবং বাংলাদেশের মাটিতে বসে কেউ মোদি সরকার বা ভারতের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে কাজ করত, তবে কি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঢাকা সফর করতেন? প্রতিমন্ত্রীর এই একটি মাত্র প্রশ্ন ভারতের আধিপত্যবাদী আচরণ এবং দ্বিমুখী কূটনৈতিক নীতিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, আওয়ামী লীগের নির্বাসিত নেতাদের কর্মকাণ্ড ভারতের জন্যও কোনো ইতিবাচক সুফল বয়ে আনবে না; বরং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে এই শেখ হাসিনা ও তাঁর সন্ত্রাসী নেতৃত্বই এখন প্রধান ‘বাধা’। ১৫ বছরেরও বেশি সময় শাসন করা এক গণহত্যাকারী স্বৈরাচারকে উৎখাত করতে বাংলাদেশের মানুষ জীবন দিয়েছে, তাই অতীতে বাংলাদেশকে চব্বিশ ঘণ্টার জন্য দাস বানিয়ে রাখার ব্যবস্থার সঙ্গে জনগণের একটি স্পষ্ট এবং চিরতরে ‘পরিষ্কার বিচ্ছেদ’ প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরকে ঘিরে যে কূটনৈতিক প্রস্তাবনা ও উদ্যোগ চলছে, তা কোনো একক অনুকম্পার সফর নয়; এটি হবে একটি সম্পূর্ণ দ্বিপক্ষীয় ও সমমর্যাদার আলোচনা। তবে এর জন্য প্রয়োজন ‘পারস্পরিক সহযোগিতা’ এবং সহায়ক ও শ্রদ্ধাপূর্ণ পরিবেশ। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর গঠনমূলক ভূমিকার প্রশংসা করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, দিল্লি যদি ঢাকার বাস্তবিক পরিস্থিতি সম্পর্কিত ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের সুপারিশ ও মতামতকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে, তবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জটিলতা নিরসন সম্ভব। ভারত যদি শেখ হাসিনা ও তাঁর সহযোগীদের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং ঢাকার মাটিতে যেমন ভারতকে ক্ষতিগ্রস্ত করার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না, দিল্লিও যদি একই পারস্পরিক নীতির চর্চা করে—তবে দুই দেশের জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে আলোচনার পথ উন্মুক্ত হবে। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে দিল্লির নীতিনির্ধারকেরা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যে নীতি অনুসরণ করেছেন, তা ছিল মূলত কৌটিল্যের চাণক্যনীতির এক আধুনিক সংস্করণ। তারা একটি রাষ্ট্রের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও গণতান্ত্রিক অধিকারকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে কেবল একজন পুতুল শাসককে টিকিয়ে রাখার ব্যবসায় মেতে উঠেছিল। ট্রানজিট, সীমান্ত হত্যা, নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা কিংবা বাণিজ্যের ভারসাম্য—প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে বঞ্চিত করে একতরফা সুবিধা আদায় করে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ৫ আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় চাণক্য কূটনৈতিক নীতিনির্ধারকদের হিসাব-নিকাশ পুরোপুরি ভেস্তে গেছে। একজন ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিনিয়োগ করতে গিয়ে তারা পুরো ১৬ কোটি বীর জনতাকে পর বানিয়ে ফেলেছে। এখন ভারতের মাটি ব্যবহার করে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার মাধ্যমে আঞ্চলিক আধিপত্য বজায় রাখার যে অপচেষ্টা দেখা যাচ্ছে, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার তা কূটনৈতিক টেবিলেই শক্ত হাতে প্রতিহত করছে। আজ গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির নবায়ন কিংবা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংলাপে বাংলাদেশ আর কোনো নতজানু অবস্থানে নেই। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ভাষায়, দুটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ তাদের নিজ নিজ জাতীয় স্বার্থকে টেবিলে রেখেই আলোচনায় বসবে। কোনো একক দেশের ইচ্ছা বা চাপিয়ে দেওয়া চুক্তি এখন আর বাংলাদেশে কার্যকর হওয়া সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক দর্শনের সবচেয়ে বড় সাফল্য এখানেই যে, তিনি একদিকে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সমমর্যাদার ভারসাম্য রক্ষা করছেন, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য, পশ্চিমা বিশ্ব এবং এশিয়ার অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বিস্তৃত করছেন। তিনি অনুদান বা করুণার কূটনীতি বাদ দিয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বকে পররাষ্ট্রনীতির মূল চালিকাশক্তি করেছেন। নভেম্বর কিংবা তার পরবর্তীতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর নিয়ে যেসব গুঞ্জন রয়েছে, তার স্পষ্ট বার্তা সরকার ইতিমধ্যে দিয়েছে। কালকে বা পরশুর হঠাৎ কোনো তারিখে সফর হওয়াটাই প্রধান বিষয় নয়, বরং প্রধান বিষয় হলো সেই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশের কতটুকু জাতীয় স্বার্থ অর্জিত হচ্ছে। যদি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, পানির ন্যায্য হিস্যা, সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং পলাতক আসামিদের ফেরত পাঠানোর মতো জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত হয়, তবেই আন্তর্জাতিক বৈঠক বা সফর সার্থক রূপ পাবে। বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে প্রতিবেশীর ভালো সম্পর্ক চায়, তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে দুই তরফা; একতরফা দাসত্ব কিংবা হুকুমদারির দিন এখন চিরতরে অতীত। সুতরাং, মোদি কি ঢাকায় আসতেন—এই ঐতিহাসিক ও সাহসী প্রশ্নের সূচনা কেবল একটি উত্তর খোঁজার চেষ্টা নয়, এটি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর এক প্রামাণ্য দলিল। আজ ৫৫ হাজার বর্গমাইলের আকাশ-বাতাসে যে সার্বভৌমত্বের সুবাসিত সৌরভ ছড়িয়ে পড়েছে, তা প্রমাণ করে যে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার দেখানো পথ ধরে দেশনায়ক তারেক রহমান বাংলাদেশকে যে আত্মমর্যাদাপূর্ণ কূটনৈতিক দিগন্তে নিয়ে গেছেন, সেখান থেকে পিছিয়ে আসার আর কোনো সুযোগ নেই। দিল্লির চাণক্যনীতিকে উড়িয়ে দিয়ে বাংলাদেশ আজ স্বীয় মর্যাদায় উজ্জ্বল, যেখানে জাতীয় স্বার্থই শেষ কথা এবং জনগণের ক্ষমতায়নই কূটনীতির আসল শক্তি। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সহায় হোন। লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন। ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com